বিশ্ব তামাক বিরোধী দিবস
আমানতের জীবন ও তামাকের অন্ধকার ছায়া

প্রতীকী ছবি
মানবজীবনকে আল্লাহ তাআলা এক অমূল্য আমানত হিসেবে দিয়েছেন। এই জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি সুস্থ মুহূর্তের জবাবদিহি আছে। কিন্তু আধুনিক যুগে নানা ধরনের অভ্যাস মানুষের এই আমানতকে ধীরে ধীরে ক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তামাক সেবন তার মধ্যে অন্যতম, যা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিই নয়, পরিবার ও সমাজের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ইজ বিশ্ব তামাক বিরোধী দিবস। যা আমাদেরকে ভয়াবহ বাস্তবতাকে মনে করিয়ে দেয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বারবার প্রমাণ করেছে, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ অসংখ্য জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। শুধু ব্যবহারকারীই নয়, আশেপাশের মানুষও পরোক্ষ ধোঁয়ার মাধ্যমে ক্ষতির শিকার হয়। এই দিক থেকে বলা যায় যে, তামাক একটি নিঃশব্দ সামাজিক বিপর্যয়।
ইসলাম মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও সম্পদ রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘তোমরা নিজের হাতে নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৯৫)। এই একটি নির্দেশনাই জীবন ধ্বংসকারী যেকোনো অভ্যাসের বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থানকে পরিষ্কার করে দেয়। তামাক সেবন যখন ধীরে ধীরে শরীরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, তখন তা এই আয়াতের অন্তর্নিহিত বার্তার সাথেই সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।
হাদিসে প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, ‘ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিদানও ক্ষতি দিয়ে দেওয়া যাবে না’ (ইবনু মাজাহ, হাদিস : ২৩৪০)। এই নীতিটি ইসলামী আইনশাস্ত্রে একটি মৌলিক নীতি হিসেবে বিবেচিত। তামাক সেবন যেমন ব্যক্তির নিজের ক্ষতি করে, তেমনি অন্যদেরও ক্ষতির মধ্যে ফেলে। ফলে এটি ইসলামের এই মৌলিক নীতির পরিপন্থী আচরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনকে রক্ষা করা কেবল অধিকার নয়, বরং দায়িত্বও বটে। একজন মুসলমানের শরীর তার নিজের মালিকানাধীন নয়; এটি আল্লাহর দেওয়া আমানত। এই আমানতের যথাযথ ব্যবহার না করা, এমন কিছুতে নিজেকে অভ্যস্ত করা যা শরীরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, তা আত্ম-অবিচার ছাড়া আর কিছু নয়। তাই বহু সমকালীন ইসলামী ফিকহ কাউন্সিল ও আলেমগণ ধূমপানকে হারাম বা অন্তত কঠোরভাবে নিষিদ্ধযোগ্য (মাকরূহ তাহরীমী) হিসেবে উল্লেখ করেছেন, বিশেষ করে যখন এর ক্ষতি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
তামাক শুধু স্বাস্থ্য নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্যও নষ্ট করে। একজন মানুষ প্রতিদিন যে অর্থ ধূমপানে ব্যয় করে, তা অনেক সময় একটি পরিবারের প্রয়োজনীয় খাদ্য, শিক্ষা বা চিকিৎসার খরচ থেকে কেটে নেওয়া হয়। ইসলামে অপচয়কে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই’ (সূরা আল-ইসরা, আয়াত : ২৭)। এই দৃষ্টিকোণ থেকেও তামাক সেবন একটি অনর্থক ব্যয় ও আত্মবিনাশী অভ্যাস।
সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকেও ধূমপান একটি স্বাভাবিকীকৃত কিন্তু ক্ষতিকর সংস্কৃতি হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। অনেক তরুণ কৌতূহল বা সামাজিক প্রভাবের কারণে এতে জড়িয়ে পড়ে, পরে তা আসক্তিতে পরিণত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মনিয়ন্ত্রণ, সংযম ও পরিমিতিবোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা। রাসুল (সা.) সব ধরনের নেশা জাতীয় বস্তু থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, কারণ তা মানুষের বিবেক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।
তামাক ছাড়ার সংগ্রাম সহজ নয়, কারণ এটি কেবল অভ্যাস নয়, অনেকের ক্ষেত্রে আসক্তি। তবে ইসলাম কখনোই মানুষকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখে না। বরং পরিবর্তনের জন্য সাহস, নিয়ত ও প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দেয়। একজন মানুষ যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি ক্ষতিকর অভ্যাস ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তা ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে। ধূমপান ত্যাগ করা তাই শুধু স্বাস্থ্যগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি আধ্যাত্মিক উন্নতির পথও হতে পারে।
আজকের এই বিশ্ব তামাক বিরোধী দিবসে মূল প্রশ্নটি শুধু ‘তামাক কেন ক্ষতিকর’ নয়, বরং ‘আমরা কেন জেনে শুনে নিজের ক্ষতির পথে হাঁটি’। ইসলামের শিক্ষা এখানে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। জীবনকে রক্ষা করা, শরীরকে সুস্থ রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ পরিবেশ দেওয়া প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব।
তামাকমুক্ত জীবন কোনো স্লোগান নয়, এটি একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিকে যেমন শারীরিকভাবে সুস্থ রাখে, তেমনি তাকে আল্লাহর দেওয়া আমানতের সঠিক রক্ষক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে।




