অতীতের মতো অচিরেই ঘুরে দাঁড়াবে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক

আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বদিউর রহমান
দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা প্রমাণ এবং গুরুতর কোনো অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় দেরিতে হলেও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের মূল্যায়ন শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তিন দশকের পথচলায় ব্যাংকটিকে এগিয়ে নিতে যারা নিজেদের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে অবদান রেখেছেন, তাদের গুরুত্ব দিয়ে গঠন করা হয়েছে নতুন পরিচালনা পর্ষদ। রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও বিভিন্ন দলমতের ধর্মপ্রাণ প্রতিষ্ঠাতারা মিলেমিশে ব্যাংকটি পরিচালনায় যে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিগত বিভিন্ন সরকার আমলে কোনো পরিচালকের ক্ষেত্রে বঞ্চনার ঘটনা ঘটেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হয়েছে।
প্রায় দুই বছর আগে অন্তর্বর্তী সরকার এস আলম গ্রুপের সম্পৃক্ততার কারণে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক মনোনীত পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালকের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল। তখন ব্যাংকটির ভেতরে লুটপাটের কারণে ফাঁপা হয়ে যাওয়ার সন্দেহ করা হলেও একাধিক তদন্ত সংস্থার অনুসন্ধানে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। তদন্তে প্রমাণিত হয়, কোনো প্রভাবশালী বা বিতর্কিত গ্রুপের আগ্রাসনের কবলে পড়ে ব্যাংকটির সম্পদ মানের বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। এমনকি চরম দুর্দিনেও ব্যাংকটি তারল্য সংকটে না পড়ে গ্রাহকদের যেকোনো অঙ্কের টাকা সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সবদিক ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের পরীক্ষিত উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করা হয়েছে। গত অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে যে ১২টি ব্যাংকের পর্ষদ বাতিল করা হয়েছিল, তার মধ্যে শুধু আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদই গত ১৬ জুলাই পুনর্গঠন করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, আর্থিক অবস্থার উন্নতির কারণেই পরীক্ষিত উদ্যোক্তাদের হাতে ব্যাংকটি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্য ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তাদের খুঁজে পাওয়া না গেলেও এই ব্যাংকের চিত্র ভিন্ন। অচিরেই পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকজন যোগ্য উদ্যোক্তাকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করব।
বদিউর রহমান
চেয়ারম্যান
আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক
১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম এক যুগে ব্যাংকটি কাঙ্ক্ষিত সফলতার দেখা পায়নি। ২০০৭ সালে ক্লাসিফাইড বিনিয়োগ বহুগুণ বেড়ে যায় এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নানা ব্যর্থতা ফুটে ওঠে। ব্যাংকটিকে সংকট থেকে টেনে তুলতে তৎকালীন ওয়ান ইলেভেন সরকার পদক্ষেপ নেয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়। সেই কঠিন পরিস্থিতিতে পরীক্ষিত উদ্যোক্তা পরিচালকরা একমত হয়ে দক্ষতার বিচারে পর্ষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন বদিউর রহমানকে এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে আসেন আব্দুস সামাদ শেখ। মূলত এই জুটির হাত ধরেই ব্যাংকটির মজবুত ভিত্তি গড়ার কাজ শুরু হয়।
পরে ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বদিউর রহমানের আট বছরের মেয়াদকালকে ব্যাংকটির ৩০ বছরের পথচলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সময়ে আব্দুস সামাদ শেখ, একরামুল হক ও মো. হাবিবুর রহমানের মতো তিনজন ডায়নামিক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি ব্যাংকটিকে সমৃদ্ধির অনন্য নজির গড়েন। ২০০৭ সালে যেখানে প্রফিট গ্রোথ ছিল মাইনাস ২২ ভাগ, সেখানে ২০০৯ সালে তা প্লাস ১৩ ভাগ এবং ২০১৬ সালে ১৮ ভাগে উন্নীত হয়। এই আট বছরে আমানত ২ হাজার ৯৬৯ কোটি থেকে বেড়ে ১৯ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগ ২ হাজার ৯৭২ কোটি থেকে ১৯ হাজার ৬৫১ কোটি টাকায় পৌঁছায়। আমদানি-রপ্তানি ব্যবসাও বৃদ্ধি পায় এবং শাখা সংখ্যা ৫০ থেকে বেড়ে ১৪০-এ উন্নীত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক, কেপিএমজিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিচালিত নিবিড় অডিট ও পর্যালোচনার পর পরিচালনা কাঠামো পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে ২০২৬ সালে এসে আবারও সেই পরীক্ষিত উদ্যোক্তা পরিচালক বদিউর রহমানকেই নতুন পর্ষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্ষদের ইসি কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমানকে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে পর্ষদে আরও ফিরেছেন নাজমুল আহসান খালেদ, হাফেজ মো. এনায়েত উল্যা, আনোয়ার হোসেন, মোহাম্মদ আব্দুস সালাম, মো. রফিকুল ইসলাম এবং আলহাজ ইমাদুর রহমান। নতুন পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ৩০ বছর আগে কেডিএস গ্রুপের কর্ণধার খলিলুর রহমানের আহ্বানে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা এই ব্যাংকে বিনিয়োগ করেছিলেন এবং তার অভিভাবকত্বেই ব্যাংকটি নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর যাত্রা শুরু করল।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবেই ৩০ বছর আগে ব্যাংকিং জগতে প্রবেশ করেন এস আলম (সাইফুল আলম)। তবে সাবেক সচিব এ জেড এম শামসুল আলমের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকে সুশাসন ও পেশাদারিত্বের ওপরই সবসময় জোর দিয়েছেন পরিচালকরা। ২০১৭ সালে এস আলমের ছোট ভাই আব্দুস সামাদ লাবু নেতৃত্বে এলেও পর্ষদে অন্যান্য প্রভাবশালী পক্ষের শক্ত প্রতিনিধিত্ব থাকায় ব্যাংকটি কারও একক কর্তৃত্বে পরিচালিত হতে পারেনি। ফলে বড় ধরনের কোনো সংকটেও পড়েনি ব্যাংকটি। তবে নতুন পর্ষদে আব্দুস সামাদ লাবুকে আর ফেরানো হয়নি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংকের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমান বলেছেন, ‘২০০৮ সালে প্রথমবার চেয়ারম্যান হিসেবে আমাকে যখন দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক ছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ, সেই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে পরে আমার দায়িত্বের আট বছরে আমরা এই ব্যাংকটিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সক্ষম হই। বর্তমানে ২০২৬ সালে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে আবারও যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তেমনই কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখে আমাকে আবার পর্ষদের দায়িত্ব দেওয়া হলো। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব আমি যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করব। ইনশাআল্লাহ অতীতের মতো অচিরেই আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।’




