বেনাপোল স্থলবন্দর
৪১৮ সিসি ক্যামেরার ফাঁকে জব্দ পণ্য চুরি
- জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত চুরি ও জালিয়াতির ১৩০টি মামলা
- কর্মকর্তা-কর্মচারী, গুদামকর্মী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত

বেনাপোল কাস্টম হাউজ। ছবি: আগামীর সময়
মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা পণ্য জব্দের পর রাখা হয়েছিল বেনাপোল স্থলবন্দরের গুদামে। সেখান থেকে এ পণ্যগুলো চুরি করে বাইরে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের বিরুদ্ধে। কাস্টমসের একাধিক মামলায় বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারী, গুদামকর্মী ও সিঅ্যান্ডএফ (ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং) এজেন্টদের নাম এসেছে।
সম্প্রতি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বেনাপোল পোর্ট থানায় করা এক মামলায় বন্দর কর্মকর্তাসহ ১১ জনকে আসামি করেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কাস্টমসের গুদামে রাখা জব্দ করা পণ্যের বস্তা রাতের আঁধারে খুলে মালামাল বের করে বাইরে বিক্রি করা হতো।
বেনাপোল কাস্টম হাউজ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দরে চুরি ও জালিয়াতির ১৩০টি মামলা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সও বাতিল করা হয়েছে।
বন্দরে ৪১৮টি সিসি ক্যামেরা থাকলেও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চুরি-জালিয়াতি থামছে না। তবে কাস্টমসের দাবি, আগে যেসব ঘটনা গোপন থাকত, এখন সেগুলো প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে বলেই চুরির ঘটনা বেশি বলে মনে হচ্ছে।
বেনাপোল বন্দরের সব গুদাম ও ইয়ার্ড বন্দর কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করে। জব্দ করা পণ্য সংরক্ষণের জন্য রয়েছে কাস্টমসের পৃথক গুদাম।
গত ২২ জুন প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে পণ্য পাঠানোর কথা বলে একটি কাভার্ড ভ্যানে জব্দ করা পণ্য গুদাম থেকে বের করা হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারায় বেনাপোল বাজার এলাকায় ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সদস্যরা গাড়িটি আটক করেন।
পরে গাড়িটি জব্দ করা হয় এবং সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ, চালক ও তার সহকারীকে আটক করা হয়। পরে এ ঘটনায় বেনাপোল পোর্ট থানায় মামলা করা হয়। গাড়িতে ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস ও নিষিদ্ধ ওষুধ পাওয়া যায়। ঘটনার পর তদন্তের স্বার্থে দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিন কাস্টমস সিপাইকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
বেনাপোল কাস্টম হাউজের কমিশনার মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান বলেছেন, বিভাগীয় তদন্ত চলছে। তদন্তে জব্দ করা পণ্য চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাসহ বিভাগীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরেকটি ঘটনায় হুদা ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ১০০ প্যাকেট বেকিং পাউডার ঘোষণা দিলেও ১২ মার্চ থেকে ২ জুন পর্যন্ত কাস্টমসের একাধিক পরিদর্শনে ১০৮টি প্যাকেটে শাড়ি, থ্রি-পিস, শিশুদের পোশাক ও প্রসাধনী পাওয়া যায়।
পণ্যগুলো জব্দ করে ৩৭ নম্বর গুদামে রাখা হলেও পরে দেখা যায়, সেগুলো উধাও হয়ে গেছে। এ ঘটনায় গত ৯ জুন বন্দর কর্তৃপক্ষের তিন গুদাম সুপারিনটেনডেন্ট ও একজন ট্রাফিক পরিদর্শকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে কাস্টমস।
এর আগে ১৬ থেকে ২১ মে পর্যন্ত জাহাঙ্গীর এন্টারপ্রাইজের আমদানি করা গাড়ির যন্ত্রাংশ ৪১ নম্বর গুদাম থেকে নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় ১৪ জুন করা মামলায় গুদামকর্মী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়।
হুদা ইন্টারন্যাশনালের মালিক আনিসুর রহমান বলেছেন, ‘আমি ঢাকায় থাকি। ব্যবসার দৈনন্দিন কার্যক্রম কর্মচারীরাই পরিচালনা করেন। কাস্টমস আমার লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে— এটুকুই জানি।’
সাম্প্রতিক পাঁচটি এফআইআরের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কাস্টম হাউজ— উভয় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে চুরি ও চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
এ পর্যন্ত পৃথক দুই মামলায় দুই কাস্টমস কর্মকর্তা কারাগারে আছেন। এ ছাড়া প্রাথমিক তদন্তে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিন কাস্টমস সিপাইকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
মামলাগুলোয় বন্দর কর্মকর্তা, গুদামকর্মী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
বেনাপোল কাস্টম হাউজের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ আহমেদ রুবেল বললেন, ‘চুরির বিষয়ে আমরা শূন্য সহনশীল নীতি অনুসরণ করছি। বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীন কিছু গুদাম রক্ষণাবেক্ষণকারী কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একাধিক ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে।’
বেনাপোল বন্দরের পরিচালক মো. শামীম হোসেন বলেছেন, চুরি ঠেকাতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ‘আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটত, তবে সেগুলো সংবাদমাধ্যমে আসত না। এখন আমরা নিজেরাই প্রকাশ করছি, তাই চুরি বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে, বাস্তবে তা নয়।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘বন্দরের ভেতরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে— এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সেখানে রাজনৈতিক ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এমনকি কিছু কর্মকর্তাও জড়িত থাকতে পারেন। তবে দোষী প্রমাণিত হলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
তবে ৪১৮টি সিসি ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও তদন্তকারীদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় ভিডিও ফুটেজ পাওয়া বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কমিশনার ফয়জুর রহমানের অভিযোগ, আনুষ্ঠানিকভাবে চাইলেও অনেক সময় বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সিসি ক্যামেরা ফুটেজ পাওয়া যায় না।
বন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন বলেছেন, ‘ফুটেজ দিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের কোনো আপত্তি নেই। তবে নজরদারি ব্যবস্থা একটি তৃতীয় পক্ষ পরিচালনা করে। ৪১৮টি ক্যামেরার মধ্যে কোন তারিখ ও কোন সময়ের ফুটেজ প্রয়োজন, তা নির্দিষ্ট করে জানাতে হয়। প্রযুক্তিগত কারণে ফুটেজ সংগ্রহে কিছুটা সময় লাগে।’
ব্যবসায়ী নেতাদের অভিযোগ, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতার সুযোগে চুরি ও জালিয়াতি অব্যাহত রয়েছে। এতে সরকারের শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক বললেন, ‘মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি এবং পরে জব্দ করা পণ্য গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনা এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। এতে সরকারের শত শত কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়ে যাচ্ছে।’




