বন্যা চলে গেছে রেখে গেছে ক্ষত
এক মাস পিছিয়ে গেল আমন আবাদ
- কক্সবাজারে উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা
- নষ্ট হয়েছে ৮৭০ হেক্টর জমির বীজতলা
- ক্ষতিগ্রস্ত ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক

এক সপ্তাহ পানি জমে থাকার পর যখন পানি নামল, তখন সবুজ চারাগুলো কালচে হয়ে পচে গেছে।
বাংলা দিনপঞ্জির হিসাবে এখন শ্রাবণের প্রথম সপ্তাহ। এ সময়টিই আমন ধানের চারা রোপণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম। আষাঢ়ের শুরুতে বীজতলা তৈরি করে কৃষকরা ২০ থেকে ২৫ দিন অপেক্ষা করেন। এরপর সেই চারা তুলে মূল জমিতে রোপণ করা হয়। কিন্তু ঠিক এ সময় টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা এলোমেলো করে দিয়েছে কক্সবাজারের কৃষি খাতকে। বন্যার পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে হাজারো কৃষকের বীজতলা। ফলে নতুন করে বীজতলা তৈরির পাশাপাশি অন্তত এক মাস পিছিয়ে গেছে আমন আবাদ। কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা বলেছেন, এর প্রভাব শুধু চলতি মৌসুমেই নয়, বছরের সামগ্রিক ধান উৎপাদনেও পড়তে পারে।
রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি গ্রামের কৃষক আবদুল কাদের দুই একর জমিতে আমন আবাদ করবেন বলে চার গন্ডা জমিতে তৈরি করেছিলেন বীজতলা। আর কয়েক দিনের মধ্যেই চারা তুলে মূল জমিতে রোপণের পরিকল্পনা ছিল। ঠিক করে রেখেছিলেন শ্রমিকও। কিন্তু ৪ জুলাই শুরু হওয়া টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের বন্যায় কয়েক দিনের মধ্যেই তলিয়ে যায় পুরো বীজতলা। প্রায় এক সপ্তাহ পানি জমে থাকার পর যখন পানি নামল, তখন সবুজ চারাগুলো কালচে হয়ে পচে গেছে।
তার ভাষায়, ‘পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার বীজ ফেলেছি। এখন সার দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব চারা বড় করার চেষ্টা করব। কিন্তু ধানের চারা নষ্ট হয়ে অনেক পিছিয়ে গেলাম। এবার ধানও দেরিতে পাব।’
আব্দুল কাদের একা নন। জেলার আট উপজেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে একই চিত্র। কোথাও বীজতলা পচে গেছে, কোথাও আউশ ধান ডুবে নষ্ট হয়েছে, কোথাও আবার সবজি ক্ষেত ও পানবরজ তলিয়ে গেছে। পানি নেমে গেলেও অধিকাংশ কৃষককে আবার শুরু করতে হচ্ছে শূন্য থেকে।
রামুর খুনিয়াপালং ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মাজেদের ভাষ্য, ‘এখন দেরিতে আবাদ হলে শেষ সময়ে সেচের জন্য পানির প্রয়োজন হবে। তখন যদি পর্যাপ্ত পানি না পাওয়া যায়, তাহলে ফলন অনেক কমে যাবে। এতে শুধু কৃষক নয়, জেলার সামগ্রিক ধান উৎপাদনও হবে ক্ষতিগ্রস্ত।’
মাঠের এই বাস্তবতার প্রতিফলন মিলছে কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যানেও। কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার ৪ হাজার ২১১ হেক্টর ফসলি জমি। এতে সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ৪৩ হাজার ২১০ কৃষক।
সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে আউশ ধানে। জেলার ২ হাজার ৬২০ হেক্টর আউশ ক্ষেত নষ্ট হয়েছে বন্যায়। পাশাপাশি ৮৭০ হেক্টর আমনের বীজতলা, ৫৫৫ হেক্টর সবজি এবং ১৬৬ হেক্টর পানবরজ হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চকরিয়ায়; যেখানে নষ্ট হয়েছে ১ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমির ফসল। এরপর কুতুবদিয়ায় ১ হাজার ১২০ হেক্টর, পেকুয়ায় ৫০০, রামুতে ৩৪০, মহেশখালীতে ২৩৭, টেকনাফে ১৪০, সদরে ৮৮, ঈদগাঁওয়ে ৭৫ এবং উখিয়ায় ৫০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আউশের পাশাপাশি আমন মৌসুমও বড় সংকটে পড়েছে। রামুতে ১৩৩ হেক্টর, চকরিয়ায় ১১৫, ঈদগাঁওয়ে ৮৫ হেক্টর, মহেশখালী ও টেকনাফে ৬৩ হেক্টর করে, পেকুয়ায় ৫০ হেক্টর, উখিয়ায় ৩৫, সদরে ২৫ এবং কুতুবদিয়ায় ১০ হেক্টর আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে।
বন্যার ক্ষতি ধানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সবজির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চকরিয়ায়; ৩৬০ হেক্টর জমিতে। এ ছাড়া রামুতে ২০০, পেকুয়ায় ১৭০, কুতুবদিয়ায় ৬০, সদর ও মহেশখালীতে ৫০ করে, টেকনাফে ৪০, ঈদগাঁওয়ে ২০ এবং উখিয়ায় ৫ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে ১৬৬ হেক্টর পানবরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রায় অর্ধেকই মহেশখালীতে।
কৃষিবিদরা বলেছেন, দেরিতে রোপণ করা ধান পরিপক্ব হওয়ার সময় সেচের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন পর্যাপ্ত পানি না থাকলে ফলন কমে যেতে পারে উল্লেখযোগ্য হারে।
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বললেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও অব্যাহত বৃষ্টিপাতের কারণে অনেক এলাকায় ফের আবাদ শুরু করতে সময় লাগছে। বিশেষ করে আমনের বীজতলা নষ্ট হওয়ায় উৎপাদনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় অনেক এলাকায় নতুন করে বীজতলা তৈরি শুরু হয়েছে। কৃষকদের পুনর্বাসনে মানসম্মত বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।’




