যে চার অভ্যাস রিজিকে সংকীর্ণতা এনে দেয়

প্রতীকী ছবি
রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। মানুষ যতই পরিকল্পনা করুক, চেষ্টা করুক কিংবা সম্পদ সঞ্চয় করুক, তার রিজিকের পরিমাণ ও তাতে বরকত দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে। তবে আল্লাহ তাআলা দুনিয়াকে কারণ-ফলাফলের নিয়মে পরিচালনা করেন। কিছু আমল যেমন রিজিকে বরকতের কারণ হয়, তেমনি কিছু গুনাহ ও অভ্যাস মানুষের জীবন থেকে বরকত কমিয়ে দিতে পারে।
ইসলামের জ্ঞানভাণ্ডারে মানুষের দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসকে রিজিকের সংকীর্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তার যাদুল মাআদ গ্রন্থে লিখেছেন—
أَرْبَعَةُ أَشْيَاءَ تَمْنَعُ الرِّزْقَ: نَوْمُ الصُّبْحَةِ، وَقِلَّةُ الصَّلَاةِ، وَالْكَسَلُ، وَالْخِيَانَةُ
অর্থাৎ, ‘চারটি বিষয় রিজিকের প্রতিবন্ধক: সকালে ঘুমিয়ে থাকা, নামাজে কমতি করা, অলসতা এবং খেয়ানত।’ (যাদুল মাআদ, ৪/৩৭৮)
এ বক্তব্যকে হাদিস হিসেবে নয়, বরং একজন প্রখ্যাত আলেমের অভিজ্ঞতালব্ধ ও শরিয়তের বিভিন্ন দলিলের আলোকে করা একটি গুরুত্বপূর্ণ নসিহত হিসেবে দেখা উচিত। বিষয়গুলো একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এগুলো মানুষের জীবনের বরকতের সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত।
১. সকালে ঘুমিয়ে থাকা (نَوْمُ الصُّبْحَةِ ) :
দিনের শুরুতে, বিশেষ করে ফজরের পর ঘুমিয়ে থাকা। ভোরের সময়টি মানুষের কর্মজীবনের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতের দিনের প্রথমভাগে বরকতের জন্য দোয়া করেছেন—
اللَّهُمَّ بَارِكْ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا
‘হে আল্লাহ, আমার উম্মতের ভোরবেলায় বরকত দান করুন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৬০৬; তিরমিজি, হাদিস : ১২১২)
অতএব ফজরের পর অকারণে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে দিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নষ্ট করা একজন মানুষের কর্মক্ষমতা ও সময়ের বরকত কমিয়ে দিতে পারে। অবশ্য প্রয়োজন, অসুস্থতা বা রাতের বিশেষ দায়িত্বের কারণে ঘুমের প্রয়োজন হলে বিষয়টি ভিন্ন।
২. নামাজে কমতি করা (قِلَّةُ الصَّلَاةِ) :
নামাজ মুমিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলোর একটি। যে মানুষ আল্লাহর সঙ্গে নিজের সম্পর্ক দুর্বল করে, তার জীবনে প্রকৃত বরকত কীভাবে আসবে?
মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা তালাক, আয়াত : ২-৩)
নামাজ শুধু আখিরাতের সাফল্যের মাধ্যম নয়, বরং তাকওয়া ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার মাধ্যমে দুনিয়ার জীবনেও কল্যাণের দরজা খুলে দেয়।
৩. অলসতা (الْكَسَلُ) :
ইসলাম মানুষকে কর্মবিমুখ হতে শেখায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই অলসতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ
‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই অক্ষমতা ও অলসতা থেকে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৩৬৯; মুসলিম, হাদিস : ২৭০৬)
রিজিকের জন্য বৈধ উপায়ে চেষ্টা করাও ইসলামের শিক্ষা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِن رِّزْقِهِ
‘তোমরা পৃথিবীর পথে-প্রান্তরে বিচরণ করো এবং তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে আহার করো।’ (সুরা মুলক, আয়াত : ১৫)
অর্থাৎ তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করাও বান্দার দায়িত্ব।
৪. খেয়ানত الْخِيَانَةُ) :
মানুষের আমানত, দায়িত্ব, ব্যবসায়িক লেনদেন কিংবা অন্যের অধিকার নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করা ইসলামে গুরুতর অপরাধ।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْخَائِنِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ খেয়ানতকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ৫৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
أَدِّ الْأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ
‘যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে, তার আমানত তার কাছে ফিরিয়ে দাও।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫৩৪; তিরমিজি, হাদিস : ১২৬৪)
খেয়ানতের মাধ্যমে হয়তো সাময়িকভাবে কারও সম্পদ বাড়তে পারে, কিন্তু তাতে বরকত থাকে না। হারাম বা অন্যের অধিকার আত্মসাৎ করে অর্জিত সম্পদ বাহ্যিকভাবে প্রাচুর্য মনে হলেও তা মানুষের শান্তি, আস্থা ও জীবনের কল্যাণ কেড়ে নিতে পারে।
রিজিক তাই শুধু কত টাকা আয় করছি, তার হিসাব নয়; কতটুকু হালাল, কতটুকু বরকতময় এবং কতটুকু আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভোরের মূল্যবান সময়কে কাজে লাগানো, নামাজে যত্নবান হওয়া, অলসতা পরিহার এবং আমানতদারিতা অবলম্বন করা একজন মুমিনের জীবনে কল্যাণের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, রিজিকের প্রকৃত মালিক আল্লাহ। বান্দার দায়িত্ব হলো হালাল পথে চেষ্টা করা, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা। কারণ সম্পদের প্রাচুর্য সবসময় রিজিকের প্রাচুর্য নয়; অনেক সময় অল্প সম্পদেও যে প্রশান্তি, স্বস্তি ও কল্যাণ থাকে, সেটিই প্রকৃত বরকত।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক





