Agamir Somoy E-Paper
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আগামীর সময়
প্রাণের ডাকে ছোটেন রবি
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় ইসলাম

সত্যের সন্ধানে: ইমাম গাজ্জালী ও আরজ আলী মাতুব্বর

শহিদুল ইসলাম
agamir somoy
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:১৭
সত্যের সন্ধানে: ইমাম গাজ্জালী ও আরজ আলী মাতুব্বর

ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (রহ.) ও আরজ আলী মাতুব্বর - সংগৃহীত ছবি

মানুষের ইতিহাস মূলত সত্যের অনুসন্ধানের ইতিহাস। মানুষ কে, কোথা থেকে এসেছে, এই বিশ্বজগতের স্রষ্টা কে, জীবনের উদ্দেশ্য কী, মৃত্যুর পর কী আছে এবং নৈতিকতার চূড়ান্ত ভিত্তি কোথায়, এসব প্রশ্ন যুগে যুগে মানুষের চিন্তাকে আলোড়িত করেছে। কেউ এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন ওহি ও ধর্মের আলোকে, কেউ যুক্তি ও দর্শনের মাধ্যমে, আবার কেউ উত্তর খুঁজেছেন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগত ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানকে জ্ঞানের প্রধান ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমে।

ইসলামী চিন্তার ইতিহাসে ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (রহ.) এবং বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের চিন্তার জগতে আরজ আলী মাতুব্বর দুটি ভিন্ন মেরুর গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাদের সময়, সমাজ, জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান ও বিশ্বাসের ভিত্তি ছিল ভিন্ন। তবু একটি জায়গায় তাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে: উভয়েই প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন এবং সত্যের সন্ধানে চিন্তা করেছেন। তবে সত্য নির্ণয়ের পদ্ধতি ও জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে তাদের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ইমাম গাজ্জালী: সংশয় পেরিয়ে নিশ্চিত জ্ঞানের সন্ধানে

ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (রহ.) ছিলেন একাধারে ইসলামী ধর্মতত্ত্ববিদ, দার্শনিক, ফকিহ, যুক্তিবিদ ও সুফি চিন্তাবিদ। তার চিন্তাজগৎ অত্যন্ত বিস্তৃত। তিনি অন্ধ অনুকরণের পরিবর্তে জ্ঞান, যুক্তি, আত্মশুদ্ধি এবং ওহির আলোকে সত্যকে যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

তার বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আল-মুনকিয মিনাদ-দালাল’ (المنقذ من الضلال)। নামটির অর্থ ‘ভ্রান্তি থেকে মুক্তি’ বা ‘বিভ্রান্তি থেকে উদ্ধার’। গ্রন্থটিতে তিনি নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক যাত্রার কথা তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন জ্ঞানপদ্ধতি ও মতবাদের সঙ্গে পরিচয়, সংশয়, অনুসন্ধান এবং শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত জ্ঞানের সন্ধান তার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

এই গ্রন্থে তিনি জ্ঞানীদের বিভিন্ন শ্রেণি ও তাদের অনুসন্ধানপদ্ধতি আলোচনা করেছেন। বিশেষভাবে তিনি ধর্মতত্ত্ববিদ, দার্শনিক, বাতিনিয়া বা তালিমিয়্যাহ এবং সুফিদের চিন্তা ও পদ্ধতি পর্যালোচনা করেছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, সত্য অনুসন্ধানে শুধু একটি জ্ঞানপদ্ধতির ওপর নির্ভর করলে পূর্ণ সত্যে পৌঁছানো সব সময় সম্ভব নয়।

ইমাম গাজ্জালীর চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি মানুষের বুদ্ধিকে অস্বীকার করেননি; বরং বুদ্ধির সীমা ও কার্যকারিতা উভয়কেই স্বীকার করেছেন। তার কাছে বুদ্ধি সত্য বোঝার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, কিন্তু অদৃশ্য জগত, নবুয়ত, পরকাল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত বিধানের ক্ষেত্রে ওহির জ্ঞান অপরিহার্য।

আরজ আলী মাতুব্বর: প্রশ্নের মধ্য দিয়ে সত্যের অনুসন্ধান

অন্যদিকে আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন বাংলার একজন স্বশিক্ষিত চিন্তক ও লেখক। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সত্যের সন্ধানে’ মূলত ধর্ম, ঈশ্বর, আত্মা, পরকাল, প্রকৃতি, নৈতিকতা ও মানবজীবনের বিভিন্ন মৌলিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে রচিত।

গ্রন্থটির বৈশিষ্ট্য হলো প্রশ্ন করার প্রবণতা। তিনি প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস ও ব্যাখ্যার সামনে একের পর এক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তার আলোচনায় আত্মা, ঈশ্বর, পরকাল, ধর্ম, প্রকৃতি ও বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে বহু প্রশ্ন রয়েছে।

যেমন আত্মা সম্পর্কে তিনি জানতে চান, মানুষ কি কেবল রক্ত-মাংস-অস্থি-মজ্জায় গঠিত দেহ, নাকি এর বাইরে মানুষের কোনো স্বতন্ত্র সত্তা রয়েছে? যদি আত্মা থাকে, তবে তার প্রকৃতি কী? মৃত্যুর পর তার অস্তিত্ব কীভাবে থাকে?

ঈশ্বর সম্পর্কে তিনি প্রশ্ন করেছেন, সর্বশক্তিমান ও নিরাকার স্রষ্টার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মীয় ধারণাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। একইভাবে তিনি আল্লাহর ন্যায়বিচার, দয়া, মানুষের স্বাধীনতা, পাপ-পুণ্য এবং সৃষ্টিজগতের দুঃখ-কষ্ট নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

পরকাল সম্পর্কেও তার প্রশ্ন ছিল যুক্তিনির্ভর। কবরের আজাব, জান্নাত-জাহান্নাম, আত্মার অস্তিত্ব এবং মৃত্যুর পর জীবনের প্রকৃতি সম্পর্কে তিনি প্রচলিত ধর্মীয় ধারণাগুলোকে যুক্তির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন।

দুই চিন্তকের জ্ঞানতত্ত্বের পার্থক্য

ইমাম গাজ্জালী ও আরজ আলী মাতুব্বরের মধ্যে মূল পার্থক্যটি তাদের জ্ঞানতত্ত্বে।

ইমাম গাজ্জালী মনে করেন, মানববুদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সীমাবদ্ধ। মানুষের ইন্দ্রিয় ও যুক্তির বাইরে এমন অনেক বাস্তবতা রয়েছে, যা ওহির মাধ্যমে জানা যায়। আল্লাহ, ফেরেশতা, নবুয়ত, পরকাল ইত্যাদি অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান অর্জনে ওহির প্রয়োজন রয়েছে।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী। তিনি তার অদৃশ্যের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না, তবে তার মনোনীত রাসুলের কাছে প্রকাশ করেন।’ (সুরা জিন, আয়াত : ২৬-২৭)

অন্যদিকে আরজ আলী মাতুব্বর ধর্মীয় দাবিগুলোকে মানুষের যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে যাচাই করার চেষ্টা করেছেন। তার প্রশ্নগুলোর বড় অংশের ভিত্তি ছিল দৃশ্যমান জগত ও মানববুদ্ধি।

এখানেই তাদের চিন্তার মৌলিক ব্যবধান। একজন ওহিকে জ্ঞানের অপরিহার্য উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছেন; অন্যজন ধর্মীয় দাবিগুলোকে মূলত মানবীয় যুক্তি ও অভিজ্ঞতার আলোকে যাচাই করতে চেয়েছেন।

গাজ্জালীর কাছে ওহি কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইমাম গাজ্জালীর চিন্তায় নবুয়ত একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। মানুষের বুদ্ধি তাকে অনেক কিছু বুঝতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু মানুষের জ্ঞান সর্বব্যাপী নয়। মানুষ প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারে, কিন্তু অস্তিত্বের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, পরকাল, ইবাদতের বিধান এবং আল্লাহর ইচ্ছা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান কেবল মানুষের নিজস্ব বুদ্ধি দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যদি সন্দেহে থাক আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি সে সম্পর্কে, তবে এর অনুরূপ একটি সূরা রচনা করে আনো এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সব সাক্ষীকে ডাকো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৩)

এর পরের আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর যদি তোমরা তা না পার এবং কখনোই তা পারবে না, তবে সেই আগুনকে ভয় কর, যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর; যা অবিশ্বাসীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৪)

ইমাম গাজ্জালীর চিন্তার ভিত্তি ছিল এমনই একটি বিশ্বাস যে, মানুষের জ্ঞানকে ওহির জ্ঞানের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।

প্রকৃতি ও কোরআন

কোরআন মানুষকে প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করেছে। আকাশ, পৃথিবী, রাত-দিন, বৃষ্টি, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তার নিদর্শন অনুধাবনের আহ্বান কোরআনে বারবার এসেছে।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তিনিই বায়ু পাঠান তাঁর রহমতের পূর্বে সুসংবাদ হিসেবে। অবশেষে যখন তা ভারী মেঘ বহন করে, তখন আমি তা কোনো মৃত ভূখণ্ডের দিকে চালিয়ে দিই; অতঃপর তা থেকে পানি বর্ষণ করি এবং তা দ্বারা সব ধরনের ফল উৎপন্ন করি।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৫৭)

একইভাবে সূরা ইয়াসিনে বলা হয়েছে, ‘সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া এবং রাতও দিনের অগ্রবর্তী হতে পারে না। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে।’ (সুরা ইয়াসিন, আয়াত : ৪০)

এ ধরনের আয়াত মানুষকে মহাবিশ্ব ও প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে। তবে কোরআনের প্রতিটি আয়াতকে আধুনিক বিজ্ঞানের কোনো নির্দিষ্ট তত্ত্বের সঙ্গে জোর করে মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন নেই। কোরআনের মূল উদ্দেশ্য বিজ্ঞানগ্রন্থ হিসেবে পৃথিবীর সব বৈজ্ঞানিক সূত্র উপস্থাপন করা নয়; বরং সৃষ্টিজগতের নিদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে স্রষ্টা, জীবন ও অস্তিত্বের সত্য নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান করা।

আত্মা ও মানুষের প্রকৃতি

আরজ আলী মাতুব্বরের প্রশ্নগুলোর একটি বড় অংশ আত্মাকে ঘিরে। তিনি জানতে চেয়েছেন, দেহের বাইরে মানুষের কোনো স্বতন্ত্র সত্তা আছে কি না এবং মৃত্যুর পর সেই সত্তার অস্তিত্ব কীভাবে থাকে।

ইসলামী দৃষ্টিতে মানুষের অস্তিত্ব কেবল জৈবিক দেহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোরআনে মানুষের সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায় উল্লেখ করে তার মধ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে রূহ প্রদানের কথা বলা হয়েছে। তবে রূহের প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান সীমিত।

পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘তারা তোমাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলো, রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশের অন্তর্ভুক্ত। আর তোমাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে সামান্যই।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ৮৫)

এই আয়াতটি আত্মা বা রূহ সম্পর্কে ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা নির্ধারণ করে। অর্থাৎ মানুষ রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারে, চিন্তা করতে পারে, কিন্তু তার পূর্ণ প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান সীমিত।

পরকাল: বিশ্বাস ও যুক্তির প্রশ্ন

আরজ আলী মাতুব্বর পরকাল সম্পর্কেও বহু প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, মৃত্যুর পর মানুষ কীভাবে সুখ-দুঃখ অনুভব করবে, কবরের আজাব কীভাবে হবে, জান্নাত ও জাহান্নামের প্রকৃতি কী এবং এসব বিশ্বাসকে কীভাবে যুক্তির মাধ্যমে বোঝা যায়।

ইসলামের দৃষ্টিতে পরকাল অদৃশ্য জগতের অন্তর্ভুক্ত। তাই এর পূর্ণ বিবরণ মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিষয় নয়। এ সম্পর্কে জ্ঞান লাভের প্রধান উৎস হলো কোরআন ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহিহ সুন্নাহ।

ইমাম গাজ্জালীর চিন্তায় পরকালীন জীবনের বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার কাছে দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং পরকাল চিরস্থায়ী। ফলে বুদ্ধিমান মানুষের কর্তব্য হলো ক্ষণস্থায়ী জীবনের মোহে এমনভাবে নিমজ্জিত না হওয়া, যাতে অনন্ত জীবনের প্রস্তুতি নষ্ট হয়ে যায়।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর পার্থিব জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া কিছুই নয়; আর পরকালের আবাসই উত্তম তাদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে। তোমরা কি বুঝবে না?’ (সুরা আনআম, আয়াত : ৩২)

মেরাজ, মুজিজা ও অদৃশ্য জগত

আরজ আলী মাতুব্বর মেরাজসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অলৌকিক ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন করেছেন। তার প্রশ্নের ভিত্তি ছিল, মানুষের সাধারণ অভিজ্ঞতার সঙ্গে এসব ঘটনার সামঞ্জস্য কীভাবে বোঝা যায়।

ইসলামী বিশ্বাসে মুজিজা সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রমী ঘটনা, যা নবুয়তের সত্যতার নিদর্শন হিসেবে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংঘটিত হয়। তাই মুজিজাকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মানদণ্ডে বিচার করা হলে ইসলামী বিশ্বাসের প্রকৃত কাঠামোটি বোঝা সম্ভব নয়।

মেরাজ সম্পর্কেও কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যিনি তার বান্দাকে রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় ভ্রমণ করিয়েছেন, যার চারপাশ আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাই।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ১)

অতএব ইসলামী দৃষ্টিতে মেরাজ শুধু একটি দার্শনিক ধারণা নয়; এটি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুজিজা।

সত্যের অনুসন্ধানে ভিন্ন দুই পথ

ইমাম গাজ্জালী ও আরজ আলী মাতুব্বর উভয়েই প্রশ্ন করেছেন। উভয়েই প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে সত্যকে বুঝতে চেয়েছেন। কিন্তু তাদের অনুসন্ধানের ভিত্তি ছিল ভিন্ন।

আরজ আলী মাতুব্বর মানুষের যুক্তি, অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্নকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের যেসব বিষয় তার কাছে যুক্তিগতভাবে অস্পষ্ট বা প্রশ্নবিদ্ধ মনে হয়েছে, সেগুলো তিনি অনুসন্ধান করেছেন।

ইমাম গাজ্জালীও প্রশ্ন করেছেন, সংশয়ের মধ্য দিয়ে গেছেন এবং বিভিন্ন মতবাদ গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছেন। কিন্তু তার অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত ওহি, নবুয়ত, যুক্তি ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার সমন্বিত জ্ঞানতত্ত্বে এসে স্থির হয়েছে।

এ কারণে তাদের দুজনের চিন্তার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। একজনের কাছে সত্যের অনুসন্ধানের শেষ মানদণ্ড ছিল মানবীয় যুক্তি ও অভিজ্ঞতা; অন্যজনের কাছে মানবীয় যুক্তির সঙ্গে ওহির জ্ঞান ছিল অপরিহার্য।

সংশয়ের মূল্য ও সীমা

সত্যের অনুসন্ধানে প্রশ্নের প্রয়োজন আছে। প্রশ্ন না থাকলে জ্ঞানও এগোয় না। ইসলামী ঐতিহ্যেও চিন্তা, পর্যবেক্ষণ ও জ্ঞানার্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিতে প্রশ্নের সঙ্গে সঠিক জ্ঞানসূত্রও প্রয়োজন।

মানুষের ইন্দ্রিয় সীমাবদ্ধ, বুদ্ধিরও সীমা আছে। মানুষ অতীতের সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে পারে না, ভবিষ্যৎ দেখতে পারে না এবং অদৃশ্য জগতের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও তার নেই। তাই জ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা যায় না।

বিজ্ঞান দৃশ্যমান ও পরীক্ষাযোগ্য জগতের বহু রহস্য উন্মোচন করেছে। কিন্তু জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, নৈতিকতার পরম ভিত্তি, মৃত্যুর পরের জীবন কিংবা আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মতো প্রশ্ন বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে পুরোপুরি সমাধান করা যায় না। এসব প্রশ্নে দর্শন, নৈতিক চিন্তা ও ধর্মীয় ওহির ভূমিকা রয়েছে।

ইমাম গাজ্জালী ও আরজ আলী মাতুব্বরের জীবন ও চিন্তা পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়: মানুষের জ্ঞান অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত গভীর। মানুষ কেবল খাওয়া-পরা ও বেঁচে থাকার জন্য চিন্তা করে না; সে জানতে চায়, কেন সে পৃথিবীতে এসেছে, তার অস্তিত্বের অর্থ কী এবং মৃত্যুর পরে কী অপেক্ষা করছে।

আরজ আলী মাতুব্বর এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন সংশয় ও যুক্তির পথে। তার সত্যের সন্ধানে গ্রন্থে সেই প্রশ্নগুলোর বিস্তৃত প্রকাশ ঘটেছে। অন্যদিকে ইমাম গাজ্জালী (রহ.) নিজেও সংশয়, দর্শন ও যুক্তির নানা পথ অতিক্রম করে এমন এক জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থানে পৌঁছেছেন, যেখানে ওহি, যুক্তি এবং আত্মশুদ্ধির সমন্বয় ঘটেছে।

সুতরাং তাদের তুলনা করতে গেলে কেবল একজনকে ‘ধর্মবিশ্বাসী’ এবং অন্যজনকে ‘অবিশ্বাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করলেই আলোচনা সম্পূর্ণ হয় না। বরং দেখতে হবে, সত্য কী, সত্য জানার উপায় কী এবং সত্য নির্ণয়ের চূড়ান্ত মানদণ্ড কোথায়—এই তিন প্রশ্নে তাদের অবস্থান কী ছিল।

ইসলামী দৃষ্টিতে সত্যের পূর্ণতা কেবল মানুষের সীমিত বুদ্ধির মধ্যে আবদ্ধ নয়। মানুষ চিন্তা করবে, প্রশ্ন করবে, গবেষণা করবে, প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করবে; কিন্তু একই সঙ্গে সে স্বীকার করবে যে তার জ্ঞান সীমিত এবং স্রষ্টার জ্ঞান অসীম। কোরআন মানুষকে সেই বিনয়ই শেখায়: ‘তোমাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে সামান্যই।’ (সৃরা আল-ইসরা, আয়াত : ৮৫)

এই জায়গাতেই ইমাম গাজ্জালীর চিন্তার বিশেষ তাৎপর্য। তার কাছে সত্যের সন্ধান কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন ছিল না; সত্যকে জানা, গ্রহণ করা এবং সেই সত্য অনুযায়ী জীবনকে পরিবর্তন করাই ছিল জ্ঞানের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

অন্যদিকে আরজ আলী মাতুব্বরের প্রশ্নগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো বিশ্বাস বা ধারণাকে গভীরভাবে বোঝার জন্য প্রশ্ন ও অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। তবে প্রশ্নের উত্তর গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন জ্ঞানসূত্রকে চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা হবে, মূল পার্থক্যটি সেখানেই।

অতএব, ইমাম গাজ্জালী ও আরজ আলী মাতুব্বরের চিন্তার তুলনা মূলত দুই ধরনের সত্য-অনুসন্ধানের তুলনা: একদিকে ওহি, যুক্তি ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার সমন্বিত অনুসন্ধান; অন্যদিকে মানবীয় যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও সংশয়ভিত্তিক অনুসন্ধান। একজনের অনুসন্ধান তাকে ইসলামী বিশ্বাসের গভীরে নিয়ে গেছে, অন্যজনের অনুসন্ধান তাকে ধর্মীয় বিশ্বাসের নানা মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে।

সত্যের সন্ধান তাই শুধু প্রশ্ন করার নাম নয়; সত্যকে চেনার জন্য সঠিক জ্ঞানসূত্র নির্বাচন করাও সত্যের সন্ধানেরই একটি অপরিহার্য অংশ।

সহায়ক গ্রন্থাবলী:

১. ডা. জাকির নায়েক: আল কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান। রুপান্তর ও সম্পাদনা এইচ.এম.করিম

২. মুহম্মদ হাবিবুর রহমান: যার যা ধর্ম

৩. ড. আমিনুল ইসলাম: বাঙালির দর্শন, প্রাচীনকাল থেকে সমকাল।

৪. শহিদুল ইসলাম: সমাজ জীবন ও সংস্কৃতি

৫. গোলাম মোস্তফা: ইসলাম ও কমিউনিজম

৬. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব দর্শন দিবস ‘২৪ স্মরনিকা।


লেখক: প্রাবন্ধিক, প্রভাষক দর্শন বিভাগ, সরকারি ইস্পাহানী কলেজ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

E-mail:- [email protected]

ইমাম গাজ্জালীআরজ আলী মাতুব্বর
    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    ডিজেল ৬ ডলার ছাড়িয়ে বিপাকে মার্কিন পরিবার

    ডিজেল ৬ ডলার ছাড়িয়ে বিপাকে মার্কিন পরিবার

    ডাকসুর ৩ কাণ্ড তদন্তে ঢাবির ৩ কমিটি

    ডাকসুর ৩ কাণ্ড তদন্তে ঢাবির ৩ কমিটি

    ইউক্রেন-রাশিয়া একে অপরের জ্বালানি স্থাপনায় আর হামলা চালাবে না: ট্রাম্প

    ইউক্রেন-রাশিয়া একে অপরের জ্বালানি স্থাপনায় আর হামলা চালাবে না: ট্রাম্প

    চাঁদের পিঠে আলোকপিণ্ড

    চাঁদের পিঠে আলোকপিণ্ড

    দুই বছর পর সচিব সভায় বসছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা, আসতে পারে যে নির্দেশ

    দুই বছর পর সচিব সভায় বসছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা, আসতে পারে যে নির্দেশ

    পল্লবীতে বস্তাবন্দির ভিডিও, চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধার নজরুল

    পল্লবীতে বস্তাবন্দির ভিডিও, চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধার নজরুল

    তিন মাসে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বেড়েছে ৫ হাজার

    তিন মাসে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বেড়েছে ৫ হাজার

    রিজভীর সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের বৈঠক

    রিজভীর সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের বৈঠক

    ঢাবি ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান মবের শিকার তাহসিনের

    ঢাবি ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান মবের শিকার তাহসিনের

    প্রাণের ডাকে ছোটেন রবি

    প্রাণের ডাকে ছোটেন রবি

    ইরানে এক সপ্তাহে ২ সুন্নি নেতাকে হত্যা

    ইরানে এক সপ্তাহে ২ সুন্নি নেতাকে হত্যা

    বিজয়ীদের হাতে বিশ্বকাপ মেগা কুইজের পুরস্কার

    বিজয়ীদের হাতে বিশ্বকাপ মেগা কুইজের পুরস্কার

    রাষ্ট্রপতিকে বরণে সেজেছে সিলেট, কড়া নিরাপত্তা

    রাষ্ট্রপতিকে বরণে সেজেছে সিলেট, কড়া নিরাপত্তা

    নতুন মেট্রোরেলের প্রকল্প উঠছে একনেকে, প্রশ্ন পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে

    নতুন মেট্রোরেলের প্রকল্প উঠছে একনেকে, প্রশ্ন পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে

    চোখের ভিশন টেস্ট কেন  ও কখন করাবেন

    চোখের ভিশন টেস্ট কেন ও কখন করাবেন