জীবনে একবার হজ ফরজ হওয়ার শরয়ী প্রজ্ঞা

সংগৃহীত ছবি
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলো হজ। এটি এমন এক ইবাদত, যেখানে মানুষের অর্থ, শরীর, সময়, ধৈর্য ও আত্মিক প্রস্তুতি একসঙ্গে প্রয়োজন হয়। তাই ইসলাম হজকে প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর ফরজ করলেও জীবনে মাত্র একবারই তা বাধ্যতামূলক করেছে। এর মধ্যেই রয়েছে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ সৌন্দর্য, মানবিকতা ও গভীর প্রজ্ঞা।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا
‘মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ করা ফরজ, যে সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯৭)
এই আয়াতে ‘যে সামর্থ্য রাখে’ কথাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইসলাম মানুষের সাধ্যের বাইরে কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেয় না।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন—
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৮৬)
হজের সফর সব যুগেই কষ্টসাধ্য ছিল। অতীতে মানুষকে মাসের পর মাস মরুভূমি পাড়ি দিতে হতো। আজও বিপুল অর্থ, শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি দয়া করে এটিকে জীবনে একবার ফরজ করেছেন।
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বললেন—‘হে মানুষ! আল্লাহ তোমাদের ওপর হজ ফরজ করেছেন, সুতরাং তোমরা হজ করো।’ তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! প্রতি বছর কি?’ তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। লোকটি তিনবার প্রশ্ন করলে নবী (সা.) বললেন— ‘আমি যদি ‘হ্যাঁ’ বলতাম, তাহলে তা ফরজ হয়ে যেত, আর তোমরা তা করতে সক্ষম হতে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৩৩৭)
এই হাদিস ইসলামের সহজীকরণ নীতির একটি বড় প্রমাণ। ইমাম নববি (রহ.) বলেছেন— ‘এ হাদিস প্রমাণ করে, হজ জীবনে একবারই ফরজ। এর বেশি আদায় নফল।’ (শরহু সহিহ মুসলিম, ৯/১০২)
জীবনে একবার হজ ফরজ হওয়ার পেছনে আরেকটি বড় প্রজ্ঞা হলো, ইসলাম মানুষের ইবাদত ও দুনিয়াবি দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য চায়। যদি প্রতি বছর হজ ফরজ করা হতো, তাহলে অধিকাংশ মানুষ পরিবার, জীবিকা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে কঠিন সংকটে পড়ে যেত।
ইমাম ইবনে আবদিল বার (রহ.) বলেছেন— ‘আল্লাহ মানুষের ওপর দয়া করে হজকে একবার ফরজ করেছেন, যেন তা কষ্ট ও অক্ষমতার কারণ না হয়।’ (আল-ইস্তিযকার, ৪/১২)
হজের আরেকটি বিশেষ দিক হলো, এটি মানুষের জীবনে এক বিশাল আত্মিক পরিবর্তনের উপলক্ষ। অনেক সময় একটি গভীর ও আন্তরিক হজ মানুষের জীবন বদলে দেয়। তাই ইসলামের উদ্দেশ্য সংখ্যাধিক্য নয়; বরং গুণগত পরিবর্তন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘মাকবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।’ (বুখারি, হাদিস: ১৭৭৩; মুসলিম, হাদিস: ১৩৪৯)
হজ জীবনে একবার ফরজ হওয়ার মধ্যে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জন্যও একটি বাস্তবিক কল্যাণ রয়েছে। যদি প্রত্যেক মুসলমানের ওপর বারবার হজ ফরজ হতো, তাহলে পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমানের জন্য মক্কায় সমবেত হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যেত।
আজকের যুগেও প্রতি বছর হাজিদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে বিভিন্ন দেশের জন্য কোটা নির্ধারণ করতে হয়। এটি প্রমাণ করে, ইসলামের বিধান মানুষের বাস্তবতা বিবেচনা করেই নির্ধারিত।
ইমাম শাতিবি (রহ.) ইসলামী শরিয়তের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন— ‘শরিয়তের মূলনীতি হলো সহজতা, ভারসাম্য ও মানুষের কল্যাণ। (আল-মুওয়াফাকাত, ২/১২১)
হজ একবার ফরজ হওয়ার আরেকটি সূক্ষ্ম শিক্ষা হলো, মানুষ যেন এ ইবাদতকে জীবনের একটি বড় প্রস্তুতি হিসেবে দেখে। কারণ হজ কেবল ভ্রমণ নয়; এটি তাওবা, আত্মশুদ্ধি ও আখিরাতমুখী জীবনের অঙ্গীকার।
হজ মানুষকে ইহরামের সাদা কাপড় কাফনের কথা স্মরণ করায়, আরাফার ময়দান কিয়ামতের ময়দানের কথা মনে করিয়ে দেয়, আর কাবার সামনে দাঁড়ানো মানুষকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার অনুভূতি দেয়। তাই জীবনে একবারের ফরজ হজও যদি প্রকৃতভাবে আদায় করা যায়, তা মানুষের জীবনে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বারবার হজ করা নিরুৎসাহিত। বরং সামর্থ্য থাকলে নফল হজ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। কিন্তু ইসলামের সৌন্দর্য হলো, এটি মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক করেছে শুধু সেই পরিমাণ, যা তার সাধ্যের মধ্যে।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, হজের মূল শিক্ষা সংখ্যায় নয়, আন্তরিকতায়। কেউ হয়তো একবার হজ করেও আল্লাহর কাছে প্রিয় হয়ে যায়, আবার কেউ বহুবার হজ করেও আত্মশুদ্ধির আসল লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না।
মহান আল্লাহ আমাদের হজের প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করার তাওফিক দিন এবং জীবনকে এমনভাবে গড়ে তোলার ক্ষমতা দিন, যাতে একবারের হজও আমাদের জন্য আখিরাতের সফলতার পাথেয় হয়ে যায়। আমিন।






