হজের সময় মোবাইল ও প্রযুক্তি ব্যবহারের আদব

ছবি: এআই
মানবসভ্যতা প্রযুক্তির এমন এক যুগে পৌঁছেছে, যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র ইবাদত হজও প্রযুক্তির প্রভাব থেকে আলাদা নয়। আজকের হাজি শুধু একটি ব্যাগ ও ইহরাম নিয়েই সফরে বের হন না; সঙ্গে থাকে স্মার্টফোন, ক্যামেরা, লাইভ সম্প্রচার, ডিজিটাল ম্যাপ, অনুবাদ অ্যাপ, স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তি ও অনলাইন যোগাযোগের অসংখ্য মাধ্যম। প্রযুক্তি হজকে সহজ করেছে, নিরাপদ করেছে, তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এনেছে; সেটি হচ্ছে, হজের মতো গভীর আধ্যাত্মিক ইবাদতে প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমারেখা ও আদব কী?
ইসলাম প্রযুক্তির বিরোধী নয়। বরং কল্যাণকর উপায়ে জ্ঞান ও উপকরণ ব্যবহারকে উৎসাহিত করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
وَسَخَّرَ لَكُم مَّا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مِّنْهُ
‘তিনি আসমান ও জমিনের সবকিছু তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন।’ (সুরা জাসিয়া, আয়াত : ১৩)
মুফাসসিরগণ বলেছেন, মানুষের উপকারে ব্যবহৃত বৈধ প্রযুক্তিও এ নিয়ামতের অন্তর্ভুক্ত। তাই হজে মোবাইল ব্যবহার নিজে কোনো সমস্যা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, সেটি ইবাদতের সহায়ক হচ্ছে নাকি অন্তরকে গাফিল করছে।
বর্তমান সময়ে হজ ব্যবস্থাপনার বড় অংশ প্রযুক্তিনির্ভর। সৌদি কর্তৃপক্ষ ডিজিটাল পরিচয়পত্র, ইলেকট্রনিক ব্রেসলেট, স্মার্ট ট্র্যাকিং, স্বাস্থ্য মনিটরিং ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে হাজিদের নিরাপত্তা ও দিকনির্দেশনা নিশ্চিত করছে। হারিয়ে যাওয়া হাজিকে খুঁজে বের করা, ভাষান্তর সেবা দেওয়া, ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা, জরুরি চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া; এসব ক্ষেত্র প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন প্রযুক্তি ইবাদতের সহায়ক না হয়ে ইবাদতের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। আজ অনেক সময় দেখা যায়, কেউ তাওয়াফ করছে কিন্তু তার মন লাইভ ভিডিওতে; কেউ আরাফায় দোয়া করছে, আবার একই সঙ্গে ক্যামেরার জন্য ভঙ্গিও ঠিক করছে। কেউ কাবা শরিফের সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়ার বদলে ‘পারফেক্ট ছবি’ তোলার ব্যস্ততায় ডুবে যাচ্ছে।
হজ মূলত ইখলাস, বিনয় ও আত্মসমর্পণের ইবাদত। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ
‘তাদেরকে এ ছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।’ (সুরা বাইয়্যিনাহ, আয়াত : ৫)
ইমাম ইবনে রাজব হাম্বলি (রহ.) বলেছেন—‘ইবাদতের প্রাণ হলো ইখলাস। বাহ্যিক আমল যত বড়ই হোক, ইখলাস ছাড়া তা মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে।’ (জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম, ১/১১)
এ কারণেই আলেমরা বলেছেন, হজের সময় মোবাইল ব্যবহার এমন হওয়া উচিত, যা ইবাদতের খুশু-খুজু নষ্ট না করে। প্রয়োজনীয় যোগাযোগ, পথনির্দেশনা, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া পড়া বা জরুরি তথ্য গ্রহণের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার প্রশংসনীয়। কিন্তু অহেতুক ছবি, দীর্ঘ লাইভ, লোক দেখানো পোস্ট বা ইবাদতকে প্রদর্শনীতে পরিণত করা আত্মিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি ভয় করি, তা হলো ছোট শিরক।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছোট শিরক কী?’ তিনি বললেন, ‘রিয়া বা লোক দেখানো।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস : ২৩৬৩০)
হজের মতো ইবাদতে রিয়ার ভয় আরও বেশি। কারণ এখানে মানুষের আবেগ প্রবল থাকে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রকাশ করার প্রবণতাও বেড়ে যায়।
প্রতিটি মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করার প্রবণতা মানুষের অন্তর্দৃষ্টি কমিয়ে দেয়। কারণ যে হৃদয় আল্লাহর স্মরণে ডুবে থাকার কথা, সেটি তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ে অন্য মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে। অথচ আল্লাহ তাআলা হজ সম্পাদনের সময়ের ব্যাপারে বলেছেন—
فَاذْكُرُوا اللَّهَ كَذِكْرِكُمْ آبَاءَكُمْ أَوْ أَشَدَّ ذِكْرًا
‘তোমরা আল্লাহকে এমনভাবে স্মরণ কর, যেমন তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করতে, বরং তার চেয়েও অধিক।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২০০)
হজের সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আদব হলো, অন্য হাজিদের কষ্ট না দেওয়া। আজকাল অনেকেই ছবি বা ভিডিও ধারণের জন্য মানুষের চলাচল আটকে দেন, তাওয়াফের মধ্যে দাঁড়িয়ে যান কিংবা দোয়ার পরিবেশে উচ্চস্বরে কথা বলেছেন। এটি ইসলামের আদববিরোধী।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ১০)
ইমাম নববি (রহ.) বলেছেন— ‘ইবাদতের সময় অন্যকে কষ্ট দেওয়া ইবাদতের সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়।’ (আল-আজকার, পৃ. ২৮৯)
তবে প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকও উপেক্ষা করা যায় না। কারণ মোবাইল অ্যাপে পাওয়া যায়; হজের মাসআলা, দোয়া, মানচিত্র, হারিয়ে যাওয়া সঙ্গীকে খুঁজে পাওয়ার উপায়। এমনকি তাৎক্ষণিক ফতোয়াও পাওয়া যায়। অনেক বয়স্ক হাজি অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারছেন। কেউ পরিবারকে নিজের নিরাপত্তার খবর দিতে পারছেন। এসবই প্রযুক্তির কল্যাণকর ব্যবহার।
এখানে মূল শিক্ষা হলো ভারসাম্য। প্রযুক্তি যেন ইবাদতের সহায়ক হয়, প্রতিবন্ধক না হয়। মোবাইল যেন আল্লাহর স্মরণে সাহায্য করে, গাফিল না বানায়। হাজি যেন ক্যামেরার সামনে নয়, আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতি নিয়ে হজ পালন করেন।
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) লিখেছেন— ‘হজের উদ্দেশ্য শুধু শরীরের সফর নয়; বরং অন্তরের আল্লাহর দিকে যাত্রা।’ (ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ১/২৪৬)
মহান আল্লাহ আমাদের এমন হজ করার তাওফিক দিন, যেখানে প্রযুক্তি থাকবে নিয়ন্ত্রিত, আর হৃদয় থাকবে আল্লাহর স্মরণে পরিপূর্ণ। আমিন।






