গালি দেওয়া কি শুধু বদভ্যাস, নাকি বড় গুনাহ

ছবি: এআই
মানুষের ব্যক্তিত্ব, রুচি ও নৈতিকতার অন্যতম পরিচয় তার ভাষা ও কথাবার্তা। একজন মানুষ কতটা শিক্ষিত, মার্জিত কিংবা নৈতিকতাসম্পন্ন, তা শুধু তার পদ-পদবি, সামাজিক অবস্থান কিংবা বাহ্যিক আচরণ দিয়ে বোঝা যায় না; বরং অন্যের সঙ্গে কথা বলার ধরন, মতবিরোধের সময় তার ভাষার ব্যবহার এবং রাগের মুহূর্তে নিজেকে সংযত রাখার ক্ষমতার মধ্য দিয়েও তার প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায়। বিশেষ করে একজন মুমিনের পরিচয় শুধু নামাজ, রোজা কিংবা অন্যান্য ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার কথাবার্তা, আচার-আচরণ ও মানুষের সঙ্গে ব্যবহারের মধ্যেও ঈমানের সৌন্দর্য প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। এ কারণেই ইসলাম গালিগালাজ, অশ্লীলতা, অভিশাপ, অপমান ও কটূক্তিকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিমের পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভাষার শালীনতার বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ
‘মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকি এবং তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি।’ (বুখারি, হাদিস: ৪৮)
হাদিসটিতে একজন মুসলিমের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে গালিগালাজকে ফাসেকি বলা হয়েছে, যা গুরুতর পাপ ও আল্লাহর অবাধ্যতার পরিচায়ক। হাদিসে মুসলিমের সঙ্গে যুদ্ধ করাকে কুফরি বলা হলেও আহলুস সুন্নাহর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অন্যায়ভাবে মুসলিমের সঙ্গে লড়াই করাকে এখানে ভয়াবহ পাপ ও কুফরিসুলভ কাজ বোঝানো হয়েছে; এর দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়া বোঝায় না। অর্থাৎ একজন মুসলিমের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা ঈমানি দায়িত্ব।
অন্য একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রকৃত মুমিনের ভাষাগত বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলেছেন,
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ، وَلَا اللَّعَّانِ، وَلَا الْفَاحِشِ، وَلَا الْبَذِيءِ
‘মুমিন কখনো দোষারোপকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীলভাষী ও কটুভাষী হতে পারে না।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭৭)
এই হাদিসের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। একজন মুমিনের মুখ থেকে এমন কথা বের হওয়া উচিত নয়, যা অন্যের আত্মমর্যাদায় আঘাত করে, কাউকে অপমানিত করে কিংবা সমাজে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়। মতবিরোধ হতে পারে, তর্ক-বিতর্ক হতে পারে, কারও অন্যায়ের প্রতিবাদও করতে হতে পারে; কিন্তু এসবের কোনোটিই অশ্লীল ভাষা ব্যবহারের বৈধতা দেয় না। সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া আর কাউকে গালিগালাজ করা এক বিষয় নয়।
কোরআনেও মানুষের সম্মানহানি, বিদ্রূপ ও অপমানজনক আচরণ থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا یَسْخَرْ قَوْمٌ مِّنْ قَوْمٍ عَسٰۤی اَنْ یَّكُوْنُوْا خَیْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَآءٌ مِّنْ نِّسَآءٍ عَسٰۤی اَنْ یَّكُنَّ خَیْرًا مِّنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوْۤا اَنْفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوْا بِالْاَلْقَابِ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوْقُ بَعْدَ الْاِیْمَانِ وَمَنْ لَّمْ یَتُبْ فَاُولٰٓىِٕكَ هُمُ الظّٰلِمُوْنَ
‘হে ঈমানদারগণ! কোন মুমিন সম্প্রদায় যেন অপর কোন মুমিন সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; কেননা যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে এবং নারীরা যেন অন্য নারীদেরকে উপহাস না করে; কেননা যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা তারা উপহাসকারিণীদের চেয়ে উত্তম পারে। আর তোমরা একে অন্যের প্ৰতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অন্যকে মন্দ নামে ডেকো না; ঈমানের পর মন্দ নাম অতি নিকৃষ্ট। আর যারা তওবা করে না তারাই তো যালিম৷’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১১)
আয়াতটি শুধু সাধারণ উপহাস কিংবা ঠাট্টা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ নয়; বরং মানুষের মর্যাদা, আত্মসম্মান ও সামাজিক সৌহার্দ্য রক্ষার একটি মৌলিক নীতিও প্রতিষ্ঠা করেছে। কাউকে হেয় করা, অপমানজনক নামে ডাকা কিংবা কথার মাধ্যমে তার ব্যক্তিত্বকে আঘাত করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।
বিশেষভাবে দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের জন্য এ বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। একজন জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কথাবার্তা শুধু তার ব্যক্তিগত রুচির পরিচয় বহন করে না; বরং তার নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক অবস্থানেরও প্রতিফলন ঘটায়। সাধারণ একজন মানুষ কাউকে গালি দিলে তা যেমন অন্যায়, তেমনি ক্ষমতা ও দায়িত্বের আসনে থেকে কাউকে গালিগালাজ করা আরও গুরুতর নৈতিক বিচ্যুতি। কারণ, দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে মানুষ শালীনতা, ন্যায়বিচার, সহনশীলতা ও সংযম প্রত্যাশা করে। তার অশালীন আচরণ অধীনস্থদের অপমানিত করে, প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এবং সমাজে অসহিষ্ণুতাকে উৎসাহিত করে। ক্ষমতা কখনো কাউকে অন্যের সম্মানহানির অধিকার দেয় না; বরং ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের অধিকার রক্ষার দায়িত্বও বেড়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (বুখারি, হাদিস: ৬০১৮)
এই নির্দেশনা বিশেষ করে নেতৃত্ব ও দায়িত্বশীলতার জায়গায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অধীনস্থ কেউ ভুল করলে তাকে সংশোধন করা যায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায়, প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া যায়; কিন্তু গালিগালাজ, অপমান ও অশ্লীল ভাষা কোনোভাবেই দায়িত্ব পালনের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না। বরং উত্তম আচরণ ও ন্যায়সংগত ব্যবহারের মাধ্যমেই একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয় দেন।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অশ্লীল ভাষা ও ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ধর্মীয় আলোচনা, রাজনৈতিক বিতর্ক কিংবা সামাজিক মতবিরোধের ক্ষেত্রেও অনেকে প্রতিপক্ষকে অশ্রাব্য ভাষায় আক্রমণ করছেন। অথচ আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন,
وَقُلْ لِعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
‘আমার বান্দাদের বলুন, তারা যেন এমন কথা বলে, যা উত্তম।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ৫৩)
অতএব, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে, তবে শালীনতা বজায় রেখে। সত্যের পক্ষে কথা বলতে হবে, তবে কাউকে অপমান না করে। মতের অমিল হলেও ভাষার সংযম হারানো যাবে না। কারণ, অশালীন ভাষা দিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না; বরং অনেক সময় সত্যের সৌন্দর্যও এতে ম্লান হয়ে যায়।
একজন মুমিনের উচিত নিজের ঈমানি অবস্থান যাচাই করার সময় শুধু নামাজ-রোজার হিসাব না নিয়ে কথাবার্তারও হিসাব নেওয়া। তার মুখ থেকে মানুষ কষ্ট পায়, নাকি শান্তি ও স্বস্তি খুঁজে পায়, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের হাতে ক্ষমতা, দায়িত্ব ও নেতৃত্ব রয়েছে, তাদের মনে রাখা উচিত, পদ-পদবি সাময়িক; কিন্তু মানুষের সঙ্গে করা আচরণের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে। প্রকৃত মুমিনের মুখে থাকবে শালীনতা, আচরণে থাকবে বিনয় এবং হৃদয়ে থাকবে মানুষের প্রতি সম্মান। কারণ, সুন্দর ভাষা শুধু ব্যক্তিত্বের অলংকার নয়, এটি ঈমানি চরিত্রের অন্যতম পরিচয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



