হাদিসের বাণী
যে ইবাদাত কোনো কাজে আসে না

প্রতীকী ছবি
অনেক মানুষ এমন ইবাদত করেন, যা মানুষকে দেখানোর জন্য। নামাজে দীর্ঘ কিয়াম, দানে প্রচার, কোরআন তিলাওয়াতে সুমধুর কণ্ঠ কিংবা দ্বীনি কাজের বাহ্যিক ব্যস্ততা দেখে মানুষ প্রশংসা করুক, এটাই যেন তাদের অপ্রকাশিত আকাঙ্ক্ষা। অথচ যে ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষেই বেশি হয়। সেই ইবাদত আখিরাতে কোনো উপকারে আসে না। বরং তা মানুষের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ، وَمَنْ يُرَائِي يُرَائِي اللَّهُ بِهِ
অর্থাৎ, ‘যে ব্যক্তি লোককে শোনানোর জন্য (ইবাদত বা নেক আমল) করে, আল্লাহ তার প্রকৃত উদ্দেশ্য মানুষের সামনে প্রকাশ করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য আমল করে, আল্লাহও কিয়ামতের দিন তাকে মানুষের সামনে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করবেন।” (বুখারি, হাদিস: ৬৪৯৯)
ইমাম ইবন হাজার আসকালানি (রহ.) ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘রিয়া’ হলো মানুষের দৃষ্টিতে বড় হওয়ার উদ্দেশ্যে ইবাদত বা নেক আমল করা। আর ‘সুমআহ’ হলো নিজের নেক আমলের কথা এমনভাবে প্রকাশ করা, যাতে মানুষ তা শুনে প্রশংসা করে এবং সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। একটি মানুষের চোখকে লক্ষ্য করে, অন্যটি মানুষের কানকে লক্ষ্য করে। তবে উভয়টিরই উদ্দেশ্য যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা অর্জন হয়, তাহলে তা ইখলাসের পরিপন্থী। (ফাতহুল বারি, ১১/৩৩৬-৩৩৭, দারুল মারিফা সংস্করণ)
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘অতএব দুর্ভোগ সেই নামাজিদের জন্য, যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন; যারা লোক দেখানোর জন্য ইবাদত করে।’ (সুরা মাউন, আয়াত: ৪-৬)
তাফসিরে কুরতুবিতে বলা হয়েছে, এই আয়াতে নামাজ পরিত্যাগকারীদের নয়; বরং তাদেরও সতর্ক করা হয়েছে, যারা নামাজ আদায় করলেও তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা কামনা করে।
রিয়া এমন একটি গোপন রোগ, যা নেক আমলকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়। এজন্যই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়ে ভয় করি, তা হলো ছোট শিরক।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ছোট শিরক কী? তিনি বললেন, ‘রিয়া (লোক দেখানো)।’ (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৩০)
কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাদের বিচার হবে, তাদের মধ্যে একজন হবে সেই ব্যক্তি, যে কোরআন শিক্ষা করেছে, ইলম অর্জন করেছে অথবা আল্লাহর পথে দান করেছে। কিন্তু যদি তার উদ্দেশ্য হয় মানুষ তাকে আলেম, ক্বারি বা দানশীল বলুক, তবে তাকে বলা হবে, ‘তুমি মিথ্যা বলেছ। তোমাকে সে নামেই ডাকা হয়েছে, যা তুমি চেয়েছিলে।’ এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম, হাদিস: ১৯০৫)
সুতরাং বাহ্যিকভাবে আমল যত বড়ই হোক, ইখলাস ছাড়া তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় চিন্তা হওয়া উচিত, আমি কত বেশি আমল করলাম, তা নয়; বরং আমার আমল আল্লাহর জন্য কতটা বিশুদ্ধ হলো।
আলী (রা.) বলেছেন, ‘আমল করার চেয়ে আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারে অধিক চিন্তা করো।’ (ইবনু আবিদ দুনইয়া, আল-ইখলাস ওয়ান-নিয়্যাহ)
ইসলামের শিক্ষা হলো, যে ইবাদত মানুষের করতালির জন্য, তা আখিরাতে কোনো কাজে আসবে না। যে ইবাদত একান্তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, সেটিই সামান্য হলেও অমূল্য। কারণ আল্লাহ মানুষের বাহ্যিক রূপ বা প্রশংসা দেখেন না; তিনি দেখেন অন্তরের নিয়ত ও আমলের ইখলাস। (মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)
আজকের সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রচার-প্রদর্শনের সংস্কৃতি এবং আত্মপ্রচারের প্রবণতার মধ্যে এই হাদিস আমাদের নতুন করে সতর্ক করে। ইবাদত তখনই সফল, যখন তার সাক্ষী কেবল আল্লাহ, আর তার প্রতিদানও একমাত্র তাঁর কাছেই প্রত্যাশিত।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক






