একান্ত নির্জনে গোনাহমুক্ত থাকার কিছু উপায়

প্রতীকী ছবি
মানুষের সামনে ভালো থাকা খুব কঠিন কোনো কাজ নয়। চারপাশে যখন মানুষের চোখ, সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক পরিচয় কিংবা নিজের ভাবমূর্তি রক্ষার তাগিদ থাকে, তখন অনেকেই নিজেকে সংযত রাখে। কিন্তু আসল পরীক্ষা শুরু হয় তখন, যখন ঘরের দরজা বন্ধ, চারপাশ নিস্তব্ধ, দেখার মতো কেউ নেই। যখন মানুষ একা থাকে, সেখানে কোনো সামাজিক ভয় নেই, নেই লজ্জার আশঙ্কা, নেই সমালোচনার ভয়। তখন শুধু থাকে নফস, শয়তানের প্ররোচনা এবং আল্লাহর প্রতি তার ঈমানের পরীক্ষা।
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর জীবন এই পরীক্ষাকে আরও কঠিন করে দিয়েছে। কারণ একটি স্মার্টফোনই একজন মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে এমন অনেক কিছুর সামনে নিয়ে যেতে পারে, যা প্রকাশ্যে দেখা বা করা তার পক্ষে কল্পনাও সম্ভব নয়। তাই গোপনে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা এখন শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, বরং ঈমান ও আত্মসংযমেরও বড় পরীক্ষা।
এমন পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের শক্তি হলো, সে মানুষের অনুপস্থিতিতেও আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করে। সে জানে, মানুষ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন। তাই নির্জনে গোনাহ থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় উপায় হলো আল্লাহর সর্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের অনুভূতি হৃদয়ে জাগ্রত রাখা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর পর্যবেক্ষক।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১) অন্য এক আয়াতে এসেছে, ‘তিনি জানেন চক্ষুর গোপন চাহনি এবং অন্তর যা গোপন করে।’ (সুরা গাফির, আয়াত : ১৯)
মানুষের চোখ সীমিত। সে একটি ঘরের ভেতর কী হচ্ছে, তারও সব জানে না। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান সীমাহীন। তাই দরজা বন্ধ করে কোনো কাজ করার আগে একজন মুমিনের মনে প্রশ্ন জাগা উচিত, ‘মানুষ না দেখলেও আমার রব কি এটি দেখছেন না?’
এই একটি প্রশ্নই অনেক গোনাহের পথ বন্ধ করে দিতে পারে।
প্রকাশ্য গোনাহের সামাজিক পরিণতি থাকে। কিন্তু গোপন গোনাহের একটি ভয়ংকর দিক হলো, মানুষ ধীরে ধীরে নিজের কাছেই তা স্বাভাবিক করে ফেলে। বারবার একই ভুল করতে করতে একসময় লজ্জাবোধ কমে যায়, অন্তরের প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে।
নির্জনে গোনাহের বড় একটি দরজা হলো চোখ। আর বর্তমান সময়ে সেই দরজা অনেক সময় হাতের মুঠোয় থাকা মোবাইলের পর্দা দিয়ে খুলে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম কিংবা ইন্টারনেটের নানা কনটেন্ট মানুষের দৃষ্টিকে খুব সহজেই হারামের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।’ (সুরা আন-নুর, আয়াত : ৩০)
তাই নিজের চোখের জন্য কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করা জরুরি। কোন ধরনের কনটেন্ট দেখা যাবে না, কোন পেজ বা অ্যাকাউন্ট এড়িয়ে চলতে হবে, কোন সময় অপ্রয়োজনীয় ইন্টারনেট ব্যবহার করা যাবে না, এসব বিষয়ে নিজের সঙ্গে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ গোনাহের সামনে গিয়ে নিজেকে শক্ত রাখার চেয়ে গোনাহের দরজায় পৌঁছানোই বন্ধ করে দেওয়া নিরাপদ।
শয়তান মানুষকে সাধারণত এক ধাপে বড় গোনাহে নিয়ে যায় না। সে ছোট একটি দৃষ্টি, একটি কৌতূহল, একটি ক্লিক কিংবা একটি কথোপকথনের মাধ্যমে শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণেই পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ৩২) আয়াতটি শুধু ব্যভিচার করতে নিষেধ করেনি, বরং তার কাছাকাছি যেতেও নিষেধ করেছে। এখান থেকে গোনাহের পূর্ববর্তী ধাপগুলো এড়িয়ে চলার শিক্ষা পাওয়া যায়। যে অ্যাপ, ওয়েবসাইট, বন্ধুত্ব, কথোপকথন বা অভ্যাস বারবার গোনাহের দিকে টেনে নেয়, তা থেকে দূরে থাকাই গোপন গোনাহ থেকে বাঁচার অন্যতম পদক্ষেপ।
আমদের আরও মনে রাখা উচিত যে, এই একাকিত্ব যেমন কখনো মানুষের পতনের কারণ হতে পারে, আবার সেটিই হতে পারে তার আত্মশুদ্ধির সবচেয়ে সুন্দর সময়। প্রশ্ন হলো, মানুষ সেই সময়টিকে কীভাবে ব্যবহার করছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত: সুস্থতা ও অবসর।’ (আল-বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)
তাই একান্ত সময়কে উদ্দেশ্যহীনভাবে মোবাইল স্ক্রল করে কিংবা অনর্থক বিনোদনে কাটিয়ে না দিয়ে কোরআন তিলাওয়াত, তাফসির পাঠ, ইসলামি বই পড়া, জিকির, দোয়া কিংবা কোনো উপকারী কাজে ব্যয় করা যেতে পারে।
যে নির্জনে মানুষ গোনাহ করতে পারত, সেই নির্জনেই যদি সে আল্লাহকে স্মরণ করে, তাহলে তার একাকিত্বই ইবাদতে পরিণত হয়।
গোপন গোনাহের বিপরীতে গোপন নেক আমল মানুষের ঈমানকে শক্তিশালী করে। এমন কিছু আমল থাকা উচিত, যার কথা মানুষ জানে না, জানার প্রয়োজনও নেই। গভীর রাতে দুই রাকাত নামাজ, নির্জনে কোরআন তিলাওয়াত, দীর্ঘ সময় ইস্তিগফার, কারও অজান্তে দান কিংবা নিভৃতে অশ্রুসিক্ত দোয়া হতে পারে এমন আমল।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সাত শ্রেণির সৌভাগ্যবান মানুষের একজন হলো, ‘যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, ফলে তার দুই চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৬০)
কী সুন্দর শিক্ষা! যে নির্জনে একজন মানুষ পাপ করতে পারে, সেই নির্জনেই সে এমন একটি আমল করতে পারে, যার সাক্ষী শুধু আল্লাহ।
মানুষের ভেতরে ভালো ও মন্দের আকর্ষণ পাশাপাশি কাজ করে। নফস অনেক সময় তাৎক্ষণিক আনন্দের দিকে টানে, আর ঈমান তাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিণতির কথা মনে করিয়ে দেয়। এই দ্বন্দ্বে যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়, সে-ই প্রকৃত বিজয়ী।
আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করেছে এবং নিজেকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছে, নিশ্চয়ই জান্নাত হবে তার আবাস।’ (সুরা নাজিয়াত, আয়াট : ৪০-৪১)
নির্জনে যখন গোনাহের সুযোগ আসে, তখন কয়েক মুহূর্ত নিজেকে থামিয়ে দেওয়া, স্থান পরিবর্তন করা, ওজু করা, নামাজে দাঁড়িয়ে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়া খুব কার্যকর হতে পারে। প্রবৃত্তির তীব্র মুহূর্তটি পার হয়ে গেলে অনেক সময় গোনাহের আকর্ষণও কমে যায়।
গোপন গোনাহ থেকে বাঁচার আরেকটি কার্যকর উপায় হলো নিজের পরিণতির কথা মনে করা। মানুষ যে কাজটি কয়েক মিনিটের আনন্দের জন্য করছে, একদিন সেই কাজের হিসাব দিতে হবে।
মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সে তা-ও দেখতে পাবে।’ (সুরা যিলযাল, আয়াত : ৭-৮)
তাই নির্জনে গোনাহের ইচ্ছা জাগলে নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে, ‘এই কাজটি যদি আমার জীবনের শেষ কাজ হয়? আজ রাতেই যদি আমাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হয়?’ অনেক সময় এই প্রশ্নই মানুষকে ফিরে আসার জন্য যথেষ্ট।
সব সতর্কতার পরও মানুষ ভুল করতে পারে। কিন্তু একটি গোনাহের পর আরেকটি ভুল হলো হতাশ হয়ে যাওয়া। শয়তান প্রথমে মানুষকে গোনাহে ফেলে, পরে তাকে বোঝায় যে তার আর ফেরার পথ নেই। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গোনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা যুমার, আয়াত : ৫৩)
তাই গোনাহ হয়ে গেলে দেরি না করে তওবা করতে হবে। তবে তওবার পাশাপাশি গোনাহের কারণটিও খুঁজে বের করতে হবে। কোন সময় দুর্বল হয়ে পড়ি, কোন পরিবেশে গোনাহের প্রবণতা বাড়ে, কোন কনটেন্ট আমাকে টেনে নেয়, কোন অভ্যাসটি আমাকে বারবার একই ভুলে ফেলছে, এসব শনাক্ত করে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মানুষের সামনে ভালো থাকা আমাদের সামাজিক পরিচয়ের অংশ হতে পারে; কিন্তু মানুষের আড়ালে ভালো থাকা আমাদের ঈমানের গভীরতার পরিচয়।
তাই নির্জনতা থেকে পালানোর প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন নির্জনতাকে বদলে দেওয়া। যে ঘর একসময় গোপন গোনাহের সাক্ষী ছিল, সেটিই হোক তওবার সাক্ষী। যে মোবাইল একসময় চোখকে হারামের দিকে টানত, সেটিই হোক কোরআন ও উপকারী জ্ঞানের মাধ্যম। যে রাত একসময় নফসের কাছে পরাজয়ের রাত ছিল, সেটিই হোক তাহাজ্জুদ ও কান্নার রাত।
কারণ তাকওয়ার সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ তখনই প্রকাশ পায়, যখন গোনাহ করার সুযোগ থাকে, কিন্তু বান্দা শুধু আল্লাহকে ভয় করে তা ছেড়ে দেয়।
মানুষের চোখের আড়ালে আপনার একটি সিদ্ধান্ত হয়তো পৃথিবীর কাছে অদৃশ্য। কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো অশ্রু, কোনো আত্মসংযম, কোনো তওবা এবং কোনো গোপন নেক আমলই অদৃশ্য নয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



