ঋণ রেখে মৃত্যুর ভয়াবহ পরিণতি

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। যার কারণে কখনো কখনো কোনো প্রয়োজনের সময় ঋণ গ্রহণ করতে হতে পারে। কিন্তু সেই ঋণই যদি দায়িত্বহীনতা, বিলাসিতা কিংবা পরিশোধের অনিচ্ছার কারণে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থেকে যায়, তাহলে তা হয়ে উঠতে পারে আখিরাতের কঠিন বোঝা। ইসলাম ঋণ গ্রহণকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং ঋণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছে। তাই ঋণ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তা পরিশোধের দৃঢ় সংকল্পও থাকা জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ঋণের ভয়াবহতা বোঝাতে বলেছেন,
إِنَّ صَاحِبَكُمْ حُبِسَ عَلَى بَابِ الْجَنَّةِ بِدَيْنٍ كَانَ عَلَيْهِ
‘নিশ্চয়ই তোমাদের সঙ্গী তার ওপর থাকা ঋণের কারণে জান্নাতের দরজায় আটকে আছে ‘ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২০১৫৭)। হাদিসটির মর্ম অত্যন্ত গভীর। মানুষের মৃত্যুর পর তার দুনিয়াবি জীবন শেষ হয়ে গেলেও মানুষের অধিকারসংক্রান্ত দায়-দায়িত্বের বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়ে যায় না। ঋণ এমন একটি অধিকার, যা পাওনাদারের হক। আল্লাহর কাছে বান্দার বহু গুনাহ ক্ষমাযোগ্য হলেও মানুষের হক আদায়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়।
ঋণের গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্য এক হাদিসে বলেছেন,
الْقَتْلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُكَفِّرُ كُلَّ شَىْءٍ إِلاَّ الدَّيْنَ
‘শহীদের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়, কিন্তু ঋণ নয়।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৮৮৬)। একজন মানুষ আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করেও যদি মানুষের ঋণ রেখে যায়, তাহলে সেই ঋণ তার জন্য আলাদা দায় হিসেবে থেকে যায়। এতে বোঝা যায়, ঋণ কোনো সাধারণ আর্থিক বিষয় নয়; এটি মানুষের অধিকার এবং আখিরাতের জবাবদিহির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
পবিত্র কোরআনও ঋণের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। সুরা বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতটি কোরআনের দীর্ঘতম আয়াত। সেখানে ঋণের লেনদেন লিখে রাখা, সাক্ষী রাখা এবং যথাযথভাবে তা সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, আর্থিক লেনদেনে অস্পষ্টতা ও বিরোধের সুযোগ বন্ধ করা। অর্থাৎ ইসলাম ঋণ নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু ঋণকে অবহেলা করার অনুমতি দেয়নি।
অন্যদিকে, কেউ যদি সত্যিই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং পরিশোধের সামর্থ্য না থাকে, তার ব্যাপারটি ভিন্ন। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আর ঋণগ্রহীতা যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দেওয়া উচিত।’ (সুরা বাকারা, আয়াত:২৮০)। ইসলাম যেমন ঋণগ্রহীতাকে দায়িত্বশীল হতে বলেছে, তেমনি পাওনাদারকেও মানবিক হতে শিক্ষা দিয়েছে।
তবে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সামর্থ্যবান ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করা জুলুম।’ (বুখারি, হাদিস: ২৪০০)
তাই ঋণ নেওয়ার আগে প্রয়োজন ও সামর্থ্য বিবেচনা করা উচিত। ঋণ নিলে তার হিসাব লিখে রাখা, সময়মতো পরিশোধের চেষ্টা করা এবং পরিবারের সদস্যদের ঋণের কথা জানিয়ে রাখা জরুরি। আর মৃত্যুর আশঙ্কা হলে নিজের ঋণ ও পাওনাদারের তথ্য উত্তরাধিকারীদের কাছে স্পষ্ট করে যাওয়া উচিত।
ঋণ মানুষের হাতে সাময়িক স্বস্তি আনতে পারে, কিন্তু পরিশোধ না করা ঋণ মৃত্যুর পরও মানুষের পিছু ছাড়ে না। তাই জীবনের হিসাব গুছিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ঋণের হিসাবটিও গুছিয়ে নেওয়া মুমিনের দায়িত্ব। কারণ দুনিয়ায় একটি স্বাক্ষর কিংবা একটি ধার নেওয়া অর্থের বিষয়, আখিরাতে কখনো কখনো জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকার কারণ হয়ে যেতে পারে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক





