এআইয়ের যুগে সত্য-মিথ্যা চেনার ইসলামী নীতি

প্রতীকী ছবি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) বিস্ময়কর অগ্রগতি মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। মুহূর্তেই তৈরি হচ্ছে লেখা, ছবি, অডিও ও ভিডিও। প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাওয়া থেকে শুরু করে জটিল বিষয়ে ধারণা নেওয়া, সব ক্ষেত্রেই এআই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। কিন্তু প্রযুক্তির এই সুবিধার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। এখন বাস্তবের মতো দেখতে ভুয়া ছবি, মানুষের কণ্ঠস্বরের অনুকরণে তৈরি অডিও এবং সম্পাদিত ভিডিও দিয়ে সহজেই মানুষকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো তথ্য সত্য কি না, তা যাচাই করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলাম মানুষকে কোনো সংবাদ শোনা বা দেখামাত্র বিশ্বাস করতে কিংবা প্রচার করতে উৎসাহিত করে না; বরং সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।’ (সুরা হুজুরাত,েআয়াত : ৬)
এ আয়াতের শিক্ষা বর্তমান এআইয়ের যুগেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কোনো ছবি, ভিডিও, সংবাদ কিংবা বক্তব্য দেখেই তা সত্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না। বরং নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করতে হবে।
বর্তমানে এআই ব্যবহার করে এমন সব ছবি ও ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে, যা দেখে প্রকৃত ঘটনা থেকে আলাদা করা কঠিন। কোনো ব্যক্তির মুখ অন্যের শরীরে বসিয়ে দেওয়া, কারও কণ্ঠস্বর নকল করে মিথ্যা বক্তব্য তৈরি করা কিংবা ঘটেনি এমন ঘটনাকে বাস্তবের মতো উপস্থাপন করা হচ্ছে। এসব কৃত্রিম উপায়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর উপাদানকে সাধারণভাবে ডিপফেক বলা হয়। এগুলোর মাধ্যমে ব্যক্তির সম্মানহানি, সামাজিক অস্থিরতা, পারিবারিক বিরোধ এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। তাই শুধু চোখে দেখা বা কানে শোনাকে সত্যের চূড়ান্ত প্রমাণ মনে করা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তা-ই বর্ণনা করে।’ (মুসলিম, মুকাদ্দিমা, হাদিস: ৫)।
অর্থাৎ যাচাই-বাছাই ছাড়াই শোনা কথা অন্যের কাছে প্রচার করা একজন মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পোস্ট, ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার ক্ষেত্রেও এ সতর্কতা অনুসরণ করা জরুরি।
ইসলাম শুধু মিথ্যা বলা নিষেধ করেনি, মিথ্যা প্রচারে সহযোগিতা করতেও নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَاَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ
‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-শুনে সত্য গোপন করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৪২)।
এ নির্দেশনা আমাদের শেখায়, ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক পক্ষপাত কিংবা কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে সত্যকে বিকৃত করা যাবে না। এআইয়ের সাহায্যে তৈরি কোনো তথ্য বা উপাদান যদি মিথ্যা হয়, তবে সেটিকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করাও প্রতারণার শামিল।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা জরুরি। কোনো তথ্য প্রচারের আগে মূল উৎস খুঁজে দেখা, একাধিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া, ছবি ও ভিডিওর প্রেক্ষাপট যাচাই করা এবং সন্দেহজনক কনটেন্ট শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। এআইয়ের দেওয়া উত্তরকেও চূড়ান্ত সত্য মনে করা যাবে না। কারণ এ প্রযুক্তি কখনো ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যা কিংবা মনগড়া সূত্রও উপস্থাপন করতে পারে। বিশেষ করে ধর্মীয় বিষয়ে কোরআনের আয়াত, হাদিসের বক্তব্য ও রেফারেন্স নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ থেকে যাচাই করা জরুরি।
প্রযুক্তি নিজে ভালো বা মন্দ নয়; এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে তা মানুষের কল্যাণ বয়ে আনবে, নাকি ক্ষতির কারণ হবে। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো সত্যকে গ্রহণ করা, মিথ্যা থেকে দূরে থাকা এবং অন্যের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া। তাই এআইয়ের দ্রুতগতির তথ্যপ্রবাহে ইসলামের সত্যনিষ্ঠা, সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার শিক্ষা আমাদের পথনির্দেশক হওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, কোনো তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার আগে তার সত্যতা যাচাই করা শুধু প্রযুক্তিগত সচেতনতা নয়, বরং এটি একজন মুসলিমের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও।
লেখক: আলেমও সাংবাদিক



