কোরআনে বর্ণিত উলুল আযম নবীগণ কারা?

সংগৃহীত ছবি
মানবজাতির ইতিহাসে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য নবী ও রাসুল প্রেরণ করেছেন। তাদের সবার লক্ষ্য ছিল এক ও অভিন্ন, মানুষকে তাওহিদের পথে আহ্বান জানানো এবং আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনার শিক্ষা দেওয়া। তবে তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন রাসুলকে আল্লাহ বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। পবিত্র কোরআনে তাদের বলা হয়েছে 'উলুল আযম' (أولو العزم), অর্থাৎ দৃঢ় সংকল্প, অবিচল ধৈর্য ও অটল প্রত্যয়ের অধিকারী রাসুলগণ। দীর্ঘ সংগ্রাম, কঠিন পরীক্ষা এবং বিরামহীন বিরোধিতার মধ্যেও তারা আল্লাহর দাওয়াত থেকে এক মুহূর্তের জন্যও বিচ্যুত হননি। তাই তাদের জীবন প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য ধৈর্য, তাকওয়া ও অধ্যবসায়ের সর্বোত্তম আদর্শ।
আরবি 'আযম' (العزم) শব্দের অর্থ দৃঢ় সংকল্প, অটল ইচ্ছাশক্তি এবং কোনো কাজ সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও অবিচল প্রচেষ্টার মাধ্যমে সম্পন্ন করার মানসিকতা। কোরআনে ধৈর্য ও তাকওয়াকে এই দৃঢ় সংকল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذَٰلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
‘আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে নিশ্চয়ই তা দৃঢ় সংকল্পের কাজ।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৬)
উলুল আযম রাসুলদের প্রতি ইঙ্গিত করে মহান আল্লাহ নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে নির্দেশ দিয়েছেন,
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ
‘অতএব, আপনি ধৈর্য ধারণ করুন, যেমন ধৈর্য ধারণ করেছেন দৃঢ়সংকল্পের
অধিকারী রাসুলগণ।’
(সুরা আল-আহকাফ, আয়াত : ৩৫)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, উলুল আযম রাসুলদের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল অবিচল ধৈর্য, আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা এবং কঠিনতম পরিস্থিতিতেও সত্যের পথে অটল থাকা।
আলেমদের অধিকাংশের মতে, উলুল আযম রাসুলের সংখ্যা পাঁচজন। তারা হলেন, নবী মুহাম্মদ (সা.), নবী নূহ (আ.), নবী ইবরাহিম (আ.), নবী মূসা (আ.) এবং নবী ঈসা (আ.)। কোরআনে এক আয়াতে এই পাঁচজনকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَأَخَذْنَا مِنْهُمْ مِيثَاقًا غَلِيظًا
‘আর স্মরণ করুন, যখন আমি নবীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং আপনার কাছ থেকেও, নূহ, ইবরাহিম, মূসা ও মারইয়ামের পুত্র ঈসা (আলাইহিমুস সালাম)-এর কাছ থেকেও। আর আমি তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম।’ (সুরা আল-আহযাব, আয়াত : ৭)
যদিও এই আয়াতে সরাসরি 'উলুল আযম' শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি, তবে মুফাসসিরগণের একটি বড় অংশ এ আয়াত এবং সুরা আল-আহকাফের ৩৫ নম্বর আয়াত একত্রে বিবেচনা করে এই পাঁচজনকেই উলুল আযম রাসুল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ইমাম ইবন কাসির (রহ.) তার তাফসিরে এ মতকে অধিকাংশ আলেমের অভিমত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (তাফসির ইবন কাসির, সুরা আল-আহযাব: ৭)
এই পাঁচজন রাসুলের জীবনে ছিল কঠিনতম পরীক্ষার দীর্ঘ অধ্যায়। নূহ (আ.) শতাব্দীর পর শতাব্দী দাওয়াত দিয়েও অল্পসংখ্যক অনুসারী পেয়েছিলেন। ইবরাহিম (আ.) তাওহিদের আহ্বান জানিয়ে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হন। মূসা (আ.) ফিরআউনের জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। ঈসা (আ.) তার জাতির বিরোধিতা ও ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হন। আর সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নির্যাতন, বয়কট, যুদ্ধ ও অসংখ্য কষ্ট সহ্য করেও মানবজাতির কাছে আল্লাহর দীন পৌঁছে দেন।
উলুল আযম রাসুলদের জীবন আমাদের শেখায় তা হচ্ছে; সত্যের পথে চলতে হলে ধৈর্য, তাকওয়া এবং দৃঢ় সংকল্পের বিকল্প নেই। প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে অবিচল থাকা মুমিনের অন্যতম গুণ। তাই কোরআনে বর্ণিত এই মহান পাঁচ রাসুল শুধু ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব নন, বরং ঈমান, আত্মত্যাগ ও অবিচলতার চিরন্তন আদর্শ। তাঁদের জীবন অনুসরণ করলেই একজন মুমিন দুনিয়ার পরীক্ষায় সফল হওয়ার পাশাপাশি আখিরাতের স্থায়ী সফলতার পথও খুঁজে পেতে পারে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




