হাদিস শাস্ত্রের আলোকে আধুনিক ফ্যাক্ট-চেকিং
- আজকের ফ্যাক্ট-চেকিং ও ইসলামে সংবাদ যাচাইয়ের অনন্য পদ্ধতি

সংবাদ যাচাই বা ফ্যাক্ট-চেকিং আজকের সাংবাদিকতার একটি অপরিহার্য অংশ। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, হাদিস শাস্ত্রে তথ্য যাচাইয়ের খুব সূক্ষ্ম এবং কার্যকর এমন কিছু পদ্ধতি বিকশিত হয়েছিল। যা আজকের দিনেও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বক্তব্য, কর্ম ও অনুমোদন সংরক্ষণের জন্য সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এবং পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন, তা শুধু ধর্মীয় জ্ঞান সংরক্ষণেই নয়; বরং তথ্য যাচাইয়ের এক অনন্য মানদণ্ড স্থাপন করে দিয়েছিল।
এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি হলো ‘সনদ’ বা বর্ণনাশৃঙ্খল। একটি হাদিস গ্রহণের আগে মুহাদ্দিসগণ খতিয়ে দেখতেন; কে কার থেকে বর্ণনা করছে, তাদের মধ্যে সাক্ষাৎ হয়েছে কি না, তাদের স্মৃতিশক্তি কেমন, তারা কতটা ন্যায়পরায়ণ ও সত্যবাদী ইত্যাদি।
এই প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপে ‘ইলমুল রিজাল’ (বর্ণনাকারীদের জীবনী বিশ্লেষণ) বলা হয়। এতে হাজার হাজার বর্ণনাকারীর জীবনী এমনভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে যে, সেখানে তাদের চরিত্র, নৈতিকতা, স্মরণশক্তি এবং নির্ভরযোগ্যতা বিশদভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিখ্যাত মুহাদ্দিস আবদুল্লাহ ইবন মুবারক (রহ.) বলেন,
“الإسناد من الدين، ولولا الإسناد لقال من شاء ما شاء”
‘সনদ দ্বীনের অংশ; সনদ না থাকলে যে যা খুশি তাই বলত।’ (মুকাদ্দিমায়ে সহীহ মুসলিম)
ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁর সহীহ মুসলিম গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিতে বর্ণিত তথ্যই গ্রহণযোগ্য। অন্যথায় তা পরিত্যাজ্য।
এ ছাড়া ইমাম ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন,
“إن هذا العلم دين، فانظروا عمن تأخذون دينكم”
‘এই জ্ঞানই দ্বীন; তাই তোমরা লক্ষ্য করো, কার কাছ থেকে তোমরা তোমাদের দ্বীন গ্রহণ করছ।’ (মুকাদ্দিমা সহীহ মুসলিম)
এই বক্তব্য শুধু ধর্মীয় জ্ঞানের ক্ষেত্রেই নয়; বরং সব ধরনের তথ্য গ্রহণের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ তথ্যের উৎস যদি সন্দেহজনক হয়, তাহলে সেই তথ্যও বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।
আধুনিক সাংবাদিকতায় আমরা সোর্স যাচাই, তথ্যের ক্রস-চেকিং এবং প্রমাণভিত্তিক রিপোর্টিংয়ের যে নীতিগুলো দেখি, সেগুলোর সঙ্গে ইসলামের এই পদ্ধতিগুলোর গভীর মিল রয়েছে। এমনকি বলা যায় যে, ইসলামি ঐতিহ্য এই ক্ষেত্রে একটি প্রাথমিক ও শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছে।
আজকের তথ্যপ্রবাহের যুগে, যেখানে গুজব ও বিভ্রান্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে এই নীতিগুলো আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com
