পান্তা-ইলিশ কবে, কীভাবে এলো বৈশাখের আয়োজনে?

আজকের পান্তা-ইলিশ একটি যুগান্তকারী সংযোজন, যা শহরের ক্যানভাসে এঁকে দেওয়া ‘ঐতিহ্যের’ আধুনিক সংস্করণ মাত্র।
পহেলা বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ। এই ধারণাটি এতটাই গেঁথে গেছে যে মনে হয় বুঝি এটিই যুগ যুগ ধরে চলে আসা বাঙালির ঐতিহ্য। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। সাদামাটা পান্তাভাত বাঙালির চিরচেনা খাবার হলেও, অভিজাত ইলিশ মাছের সঙ্গে এর এই মিলন ঘটেছে মাত্র চার দশক আগে, শহুরে এক আড্ডা থেকে।
পান্তাভাতের বয়স অনেক পুরোনো। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে এর উল্লেখ রয়েছে। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর `চণ্ডীমঙ্গল' কাব্যে `আমানি' শব্দটি দিয়ে পান্তার জলীয় অংশকে বোঝানো হয়েছে। এই ‘আমানি’ ছিল নববর্ষের একটি প্রাচীন আঞ্চলিক কৃষি উৎসব, যেখানে ভেজানো চাল বা পান্তা খাওয়ার রেওয়াজ ছিল।
এটি মূলত কৃষকের খাবার। গরমের সকালে পান্তাভাত সহজলভ্য, পুষ্টিকর এবং শরীর ঠান্ডা রাখার একটি কার্যকরী উপায়। গ্রামীণ জীবনে পান্তা খাওয়া হতো নুন, কাঁচা লঙ্কা, পেঁয়াজ বা আলুভর্তা দিয়ে। কখনো কখনো পুঁটি, কৈ, টাকি বা ট্যাংরা মাছ থাকলেও, ইলিশ ছিল অনেক দামি ও দুর্লভ।
পান্তাভাতের দীর্ঘ ইতিহাসের তুলনায় ইলিশের পদচারণা অনেক সাম্প্রতিক। ১৯৮০ বা ১৯৮১ সালের পহেলা বৈশাখে ঢাকার রমনায় এক আড্ডা থেকে এই সংযোজনের সূত্রপাত। একদল তরুণ নিজেদের উদ্যোগে চাঁদা তুলে পান্তা-ইলিশের আয়োজন করেন। এই আয়োজন বেশ সাড়া ফেলে। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী রমনায় পান্তা-ইলিশ বিক্রি শুরু করলে এটি রীতিমতো তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।
১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট নিয়মিত রমনায় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেও, পান্তা-ইলিশ আসে সেই সূত্রেই। ধীরে ধীরে এটি নব্বইয়ের দশকে এসে ঢাকা থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাঙালিয়ানার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অনুষঙ্গে পরিণত হয়।
গ্রামীণ ঐতিহ্যে পহেলা বৈশাখ মানে ছিল ভালো খাবার। যার সামর্থ্য ছিল, তিনি পোলাও-মাংস খেতেন, না হলে গরম ভাত। পান্তা খাওয়ার রেওয়াজ ছিল না বললেই চলে। শহুরে এই আয়োজনকে অনেকেই ‘পোশাকি ঐতিহ্য’ বা ব্যবসায়িক কৌশল হিসেবে দেখেন। তবুও, ইলিশের দাম ও সরবরাহজনিত জটিলতা থাকা সত্ত্বেও, এই খাবারটি নববর্ষের উৎসবের একটি অঙ্গ হয়ে গেছে।
পান্তা-ইলিশের ভোজ আজ যেমন নতুন বছরের আমেজ ছড়ায়, তেমনি এটি বাঙালির হাজার বছরের কৃষি সংস্কৃতির সঙ্গে শহুরে উদ্দীপনার এক অনবদ্য মিলন।
আজকের পান্তা-ইলিশ একটি যুগান্তকারী সংযোজন, যা শহরের ক্যানভাসে এঁকে দেওয়া ‘ঐতিহ্যের’ আধুনিক সংস্করণ মাত্র।

