জাল সনদ ধরেও সব চেষ্টা জলে!

ছবিঃ আগামীর সময়
ঢাকা সিটি ইন্টারন্যাশনাল কলেজের অধ্যক্ষ মাহবুবুল ভুইয়া। যার ক্যারিয়ার শুরু হয় একটি ভুয়া সনদে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে তার সনদের বিষয়টি; শুরুতেই তিনি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নামে যে সনদটি জমা দেন, সেটি ছিল জাল।
মাহবুবুলের নামে জাতীয় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি (নেকটার) থেকেও ইস্যু করা হয়নি কোনো সনদ। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে এই তথ্য।
শুধু মাহবুবুল নন, জাল সনদে চাকরি করছেন অনেক শিক্ষক। তারা বছরের পর বছর চাকরি করলেও সম্প্রতি ৪৭১ জন শিক্ষকের জাল সনদ চিহ্নিত করে তাদের চাকরিচ্যুত করার সুপারিশ করেছে ডিআইএ। ফেরত চাওয়া হয়েছে বেতন-ভাতা হিসেবে নেওয়া ৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
শিক্ষা খাতে শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে নিয়মিত জাল সনদ ধরার অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন ডিআইএর এক কর্মকর্তা। সেই ধারাবাহিকতায় চিহ্নিত করা হয়েছে ৪৭১ জাল সনদধারীকে। তাদের চাকরিচ্যুত করার সুপারিশ পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে।
এর আগে গত ডিসেম্বরে শনাক্ত করা হয় ১ হাজার ১৮৬ ভুয়া সনদধারী শিক্ষককে। এসব শিক্ষকের কাছ থেকে বেতন-ভাতা হিসেবে নেওয়া ২৫৩ কোটি টাকা আদায় করতে সুপারিশ করে অধিদপ্তরটি।
ডিআইএর তথ্য বলছে, জাল সনদে চাকরি করায় ২০২৩ সালে প্রথম ৬৭৮ শিক্ষক-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করার নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বেতন-ভাতা হিসেবে নেওয়া অর্থফেরতের পাশাপাশি জাল সনদধারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করারও নির্দেশ দেয় মন্ত্রণালয়। এরপর তাদের বেতন-ভাতা বন্ধ হলে অধিকাংশ শিক্ষকই দ্বারস্থ হয়েছেন উচ্চ আদালতের।
এবার বেশি জাল সনদ ধরা পড়েছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণে ২২৯ জনের। এরপর ১৯৪ জন জাল করেছেন শিক্ষক নিবন্ধন (এনটিআরসিএ) সনদ। বিএড, বিপিএড ও গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের মতো অন্যান্য বিষয়ের সনদ ভুয়া শনাক্ত হয়েছে ৪৮টি।
জাল সনদধারীদের মধ্যে এনটিআরসিএ সনদধারীর কাছ থেকে ২ কোটি ৩৯ লাখ ৭১ হাজার টাকা, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদধারীর কাছ থেকে ৪ কোটি ৮ লাখ ২৭ হাজার এবং অন্যান্য সনদধারীর কাছ থেকে ১৬ লাখ ৫৮ হাজার টাকা আদায়ের সুপারিশ করেছে অধিদপ্তর। এ ছাড়া বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে এ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে।
কর্মকর্তারা জানান, ডিআইএর প্রধান কাজ স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর বা সংস্থায় পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা। পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনা তুলে ধরার পাশাপাশি করা হয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ। এর ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এমএম সহিদুল ইসলাম জানালেন, তাদের দপ্তরের মূল কাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষণ। অর্থাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক, প্রশাসনিক ও নিয়োগের প্রক্রিয়া ঠিক আছে কি না, তা অডিট করাই ডিআইএর কাজ।
দেশের সাধারণ স্কুল ও কলেজে জাল সনদধারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময় ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও ভিন্ন চিত্র কারিগরি এবং মাদরাসা বেলায়। ডিআইএ বারবার এই দুই বিভাগে জাল সনদধারীদের চাকরিচ্যুতের সুপারিশ করলেও রহস্যজনক কারণে জাল সনদধারী শিক্ষকরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অবশ্য, কারিগরি ও মাদরাসার জাল সনদধারীদের একটি হালনাগাদ তালিকা এবং বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন আগামী বুধবার দেওয়া হবে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে।

