তেলের আগুন বাজারে
- সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব সবজির দাম বেড়েছে
- পরিবহন সংকটে সরবরাহ কমার অজুহাত বিক্রেতাদের
- ২৪ হাজারের ট্রাক ভাড়া এখন ৩০ হাজার
- ট্রিপ সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভাড়া বাড়ানোর যুক্তি চালকদের
- হরমুজ প্রাণালি বন্ধের প্রভাবে বিশ্ব বাজারেও খাদ্যের দাম
- জ্বালানির অজুহাতে দাম বাড়ানো অনৈতিক চর্চা : ক্যাব

গ্রাফিক্স : আগামীর সময়
চৈত্রের দুপুরে আকাশে গনগনে রোদ, গায়ে লাগছে আগুনের হলকার মতো আঁচ। তবে হাতিরপুল বাজারে সবজি কিনতে আসা আফরোজা আক্তার বোধ হয় তারচেয়ে বেশি অনুভব করছিলেন দামের উত্তাপ। বাজারে ১০০ টাকার কমে মিলছে না কোনো সবজি। বিক্রেতার সঙ্গে দরকষাকষি করে শেষ পর্যন্ত তিনি দুই পদের কমই কিনলেন সবজি।
আগামীর সময়ের সঙ্গে আলাপকালে তার কণ্ঠে ফুটল হতাশা আর সংশয়। বাজারে আসা প্রায় সবার চোখ-মুখই যেন আফরোজার প্রতিচ্ছবি। কারণ, সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারভেদে প্রায় সব সবজির দাম বেড়েছে কেজিতে ১০-২০ টাকা।
বিক্রেতাদের দাবি, মৌসুম শেষ হওয়ায় সরবরাহ কমে গেছে অনেক সবজির। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের সংকট, যার কারণে বেড়েছে পরিবহনব্যয়। আর সেই বাড়তি খরচের বোঝা এসে পড়েছে ভোক্তার কাঁধে।
হাতিরপুল বাজারের সবজি বিক্রেতা আবদুল জলিল জানালেন, ‘জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে পরিবহনব্যয়। যে কারণে কমেছে সরবরাহ, বেড়েছে দাম।’
বিক্রেতাদের দাবি যাচাই করতে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা হয় আগামীর সময়ের। তাদের ভাষ্য, ঢাকায় প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে সবজি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসে, যার মধ্যে অন্যতম মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, বগুড়া, কুমিল্লা ও যশোর। এই সবজিগুলো সাধারণত ঢাকার কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী এবং গাবতলী এলাকার পাইকারি বাজারগুলোয় করা হয় খালাস এবং সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে খুচরা বাজারে। যশোর থেকে ঢাকায় আগে ট্রাক ভাড়া ছিল ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকা। জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে গত সপ্তাহ থেকে সেই ভাড়া হয়েছে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা।
ফারুক হোসেন নামে এক ট্রাকচালকের দাবি, ‘তেল সংকটের জন্য ট্রিপের সংখ্যা নেমে এসেছে অর্ধেকে। জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে আগের মতো ট্রিপ দিতে পারি না। তাই বাধ্য হয়েছি ভাড়া বাড়াতে।’
জ্বালানির এই সংকট শুধু বাংলাদেশেরই নয়। ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় দেশে দেশে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম, যার বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে খাদ্যমূল্যেও।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিবেদন বলছে, জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় মার্চ মাসে বিশ্ব জুড়ে খাদ্যের দাম আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সূচক মার্চে দাঁড়িয়েছে ১২৮ দশমিক ৫ পয়েন্টে, যা ফেব্রুয়ারির সংশোধিত স্তরের তুলনায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। দাম বাড়ার এই ধারা চলছে মাস দু-এক। শস্য, মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য, ভোজ্য তেল, চিনিসহ এ সময় বেড়েছে সব ধরনের প্রধান পণ্যের দাম।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়লেও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া। বিশেষ করে, ডিজেল সংকটের কারণে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিকরা বাড়িয়ে দিয়েছেন ভাড়া। এ ছাড়া এরই মধ্যে সেচসহ উৎপাদনের অনেক ক্ষেত্রেই বেড়েছে ব্যয়।
এর সঙ্গে আছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সমন্বয় সংকট এবং তদারকির ঘাটতি। এতে উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা।
মঙ্গলবার হাতিরপুল বাজার ছাড়া আরও কয়েকটি কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব সবজিই বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১০০ টাকায়। দরকষাকষির পরও শেষ পর্যন্ত বিক্রেতার বেঁধে দেওয়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতারা।
অবশ্য কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান আগামীর সময়ের কাছে দাবি করলেন, জ্বালানি তেলের কিছুটা সংকট সৃষ্টি হলেও, দাম বাড়েনি। ব্যবসায়ীরা জ্বালানি সংকটের অজুহাতে দাম বাড়ানোর জন্য চালাচ্ছেন অনৈতিক চর্চা।
সফিকুজ্জামানের পরামর্শ, এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে কঠোর নজরদারি করতে হবে সরকারকে। বাজারে বাড়াতে হবে মনিটরিং। পাশাপাশি অনৈতিকভাবে দাম বাড়ানো ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ।
জ্বালানির দাম না বাড়লেও এর পরোক্ষ প্রভাব আছে বাজারে- এমনটাই মত সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং বা সানেমের। প্রতিষ্ঠানটির এক গবেষণায় বলা হচ্ছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটের সংঘাত ঝুঁকির মুখে ফেলেছে জ্বালানি উৎপাদন, তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল এবং আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে। হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে।
প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণ বলছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির হলে তীব্র হবে মূল্যস্ফীতির চাপ। এতে দেশে ভোক্তাপর্যায়ে একদিকে যেমন দাম পাড়তে পারে, তেমনি কমতে পারে মানুষের প্রকৃত মজুরি। ফলে কমবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা।
এ বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে। তবে তাকে মোবাইল ফোনে কল করে পাওয়া যায়নি সাড়া।
বাজার পরিস্থিতি
বাজারভেদে দেখা যায়, বরবটি, ঝিঙা, করলা, পটোল, বেগুন, চিচিঙ্গাসহ অধিকাংশ সবজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকায়। কিছু ক্ষেত্রে দাম আরও বেশি। গোল ও লম্বা বেগুন কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। পটোলের কেজি ২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। করলা ১০০-১২০, বরবটি ৮০-৯০, ঢেঁড়স ৭০-৮০, চিচিঙ্গা ৮০-৯০, ধুন্দুল ৬০-৮০, শিম ৮০-৯০, টমেটো ৬০-৮০, পেঁপে ৫০-৬০ ও লাউ ৮০-১০০ টাকা কেজি দরে চলছে কেনাবেচা। এসব সবজির দাম দু-তিন দিন আগেও ২০-৩০ টাকা কম ছিল কেজিপ্রতি।
বৈশাখকে সামনে রেখে ইলিশের বাজার চড়া। প্রতিবছরের মতো এবারও আকাশছোঁয়া ইলিশের দাম। বিক্রেতাদের দাবি, বাজারে সরবরাহ কম থাকায় বেড়েছে দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ইলিশের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা। গত সপ্তাহে ১ হাজার ৫০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৮০০ টাকায়, সেই ইলিশ এখন বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায়। ৮০০-৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা।
ডিম, মুরগি ও মাংসের দামেও দেখা গেছে ঊর্ধ্বগতি। ফার্মের ডিম প্রতি ডজন ১১৫-১২০ টাকা, যা আগের সপ্তাহেও ছিল ১১০ টাকার মধ্যে। গরুর মাংস কেজিপ্রতি ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২৫০ টাকায়। সোনালি মুরগির দাম কিছুটা কমলেও এখনো কেজিতে ৪০০ টাকার কাছাকাছি। ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৯০ টাকা।
অন্যদিকে, বর্তমানে সরকার-নির্ধারিত এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৫ টাকা। খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা ও পাম তেলের নির্ধারিত দাম ১৬৪ টাকা। তবে বাজারে খোলা বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২১০ টাকায়।

