হামলার ক্ষত কাটিয়ে ‘নিঃশঙ্ক চিত্তে’ ছায়ানট

ভয়শূন্য চিত্তে ছায়ানটের বর্ষবরণ
ধানমণ্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে গত ডিসেম্বরে যে হামলার ঘটনা ঘটেছিল, সেই ক্ষত কাটিয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই রমনার বটমূলে স্বমহিমায় ফিরেছে দেশের পথিকৃৎ এই সাংস্কৃতিক সংগঠন। মঙ্গলবার নববর্ষের প্রথম প্রভাতে ছায়ানট এমন স্বপ্নের মাতৃভূমির কথা বলেছে যেখানে— ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির/ জ্ঞান যেথা মুক্ত, গৃহের প্রাচীর’।
ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলীর বর্ষবরণ কথনেও ফিরে এসেছে হামলার সেই দুঃসহ স্মৃতি। তিনি জানাচ্ছিলেন, গত বছরও রমনায় নির্বিঘ্নে নববর্ষের অনুষ্ঠান আয়োজন এবং ১৬ ডিসেম্বর উন্মুক্ত মঞ্চে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের দুদিন পরেই ছায়ানট কার্যালয় আক্রান্ত হওয়ার কথা।
‘গভীর রাতে, ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে ভাঙা হারমোনিয়াম-তবলা-তানপুরা এবং নালন্দার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন শিশু-পুস্তকের দুঃসহ স্মৃতি। সেই রাতেই অগ্নিসংযোগ করা হয় দুই শীর্ষ সংবাদপত্র ভবনে। পরদিন আক্রান্ত উদীচী। এই সহিংস ঘটনাবলির কদিন আগেই অপদস্থ হয়েছেন বাউল শিল্পীরা। স্মরণে জেগে ওঠে, এই বটমূলে ২০০১ সালের ভয়াবহ অঘটন’, বলেছিলেন সারওয়ার আলী।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবরে গত ১৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ভবনে। একই রাতে দৈনিক প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার পত্রিকার কার্যালয়েও হামলা-অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরদিন অগ্নিসংযোগ করা হয় তোপখানা রোডে, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে।
হামলার রাতেই ‘ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তনের’ পাঠদানসহ পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয় সংগঠনের সব কার্যক্রম। পরে গত ১ জানুয়ারি থেকে দাপ্তরিক কাজ এবং তার দুদিন পর থেকে সংগীতবিদ্যায়তনের নিয়মিত পাঠদান শুরু হয় ছায়ানট ভবনে।
৯ জানুয়ারি ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবন মিলনায়তনে ‘শুদ্ধসংগীত উৎসব’ আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানে ফেরে সাংস্কৃতিক সংগঠনটি। শুদ্ধসংগীত উৎসবের উদ্বোধনী বক্তব্যে ‘সংস্কৃতির যাত্রা নির্বিঘ্ন’ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন ছায়ানট সভাপতি।
এবার আরও বড় পরিসরে উন্মুক্ত অনুষ্ঠানে ফিরেছে ছায়ানট। বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ছায়ানট সভাপতি বলেছেন, ‘নির্ভয় সমাজের’ প্রত্যাশার কথা।‘ যে সঙ্গীত বাঙালির আনন্দ-বেদনা-মিলন-বিরহ-সংকটের সঙ্গী; মুক্তিযুদ্ধ থেকে সব অধিকার অর্জনের অবলম্বন; সব ধর্ম-জাতির মানুষকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে; কোনো অপশক্তি ভয় দেখিয়ে সেই সংগীত থেকে শান্তিপ্রিয় মানুষকে নিরস্ত করতে চায়। তারা আবহমান বাংলা গানকে তার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার থেকে শেকড়বিচ্ছিন্ন করতে উদ্যত’, যোগ করেন সারওয়ার আলী।
সমাজে অসহিষ্ণুতা এবং মত প্রকাশে দলবদ্ধ নিগ্রহের শঙ্কা বেড়েছে বলেও মনে করেন ছায়ানট সভাপতি।
তার ভাষ্য, ‘মার্কিন-ইসরায়েলি নিগ্রহে আজ পারস্য সভ্যতাও ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন। বিশ্ববাসী আজ বিপর্যস্ত ও আতঙ্কিত। স্বদেশে আজ নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে সবাই কামনা করে বিশ্বশান্তি। শুনতে চাই সমাজের অভয়বাণী— যেন সংবাদকর্মীরা নির্ভয়ে প্রকৃত মত প্রকাশ করতে পারে; সকলে যেন নির্ভয়ে গাইতে পারি; যেন সংস্কৃতির সকল প্রকাশ নির্বিঘ্ন হয়— বাঙালি শঙ্কামুক্ত জীবন-যাপন করে।’
রমনার বটমূলে ভোর সোয়া ৬টায় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সম্মেলক গান ‘জাগো আলোক-লগনে’ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। অজয় ভট্টাচার্যের কথায় ও ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের সুরে গানটি পরিবেশন করেন মিরাজুল জান্নাত সোনিয়া, ঐশ্বর্য সমাদ্দার, প্রিয়ন্তু দেব ও সমুদ্র শুভম।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে বক্তব্য দেন ছায়ানট সভাপতি। ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালি-সংস্কৃতি তথা জাতিসত্তা উন্মোচনের এক বিশেষ দিন। বিগত প্রায় ছয় দশকের মতো এই দিনটিতে আমরা সব গ্লানি জ্বরা মুছে ফিরে দেখি, ফেলে আসা বছরকে।’
ষাটের দশকে রমনার বটমূলে যে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করেছিল ছায়ানট, এখন তা বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।
১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া এ উৎসব-আয়োজন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বছর ছাড়া হয়েছে প্রতিটি পহেলা বৈশাখেই; নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়েছে সুরের মূর্ছনা আর কথামালায়। কোভিডের দু্ই বছর এ আয়োজন হয় ভার্চুয়ালি।
২০০১ সালে ছায়ানটের বৈশাখ বরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। তাতে নিহত হন ১০ জন। এরপর থেকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেই হচ্ছে প্রতিবছরের বর্ষবরণের আয়োজন।



