মব নয়, সুপরিকল্পিত খুনের কারখানা

ফাইল ছবি
প্রকাশ্য দিবালোকে, ক্যামেরার সামনে, পুলিশের উপস্থিতিতে একজন মানুষ খুন হন। তারপরও আমাদের হত্যার বিচার চাইতে হয়। আর সমাজ খুব বেশি অবাকও হয় না। এই অসাড়তাই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়ংকর নৈতিক লক্ষণ। কারণ এখানে শুধু একটি জীবন নষ্ট হয়নি; নষ্ট হয়েছে ন্যায়বোধের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরকে হত্যা এবং তাঁর দরবারে হামলার ঘটনা তাই কেবল “মব” বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার নয়। এটি দেখিয়েছে, কীভাবে অভিযোগ, গুজব, ডিজিটাল উসকানি, জনসমাবেশ, প্রশাসনিক শৈথিল্য এবং প্রকাশ্য শাস্তি একে অন্যকে জুড়ে একটি হত্যাযন্ত্রে পরিণত হয়। জুলাইয়ে স্বৈরাচারের আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আর অভ্যুত্থানের আড়ালে এই হত্যাযন্ত্র বিকশিত ও শক্তিশালী হয়েছে।
‘মব’ শব্দটির একটি বিপদ আছে। শব্দটি শুনলে মনে হয়, কিছু মানুষ হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। যেন ঘটনাটি একটি দুর্ঘটনা। কিন্তু কুষ্টিয়ার ঘটনায় যে তথ্য উঠে এসেছে, তা অন্য কথা বলে। একটি পুরোনো ৩৬ সেকেন্ডের ভিডিও একাধিক ফেসবুক আইডি ও পেজ থেকে ছড়ানো হয়; পুলিশ কয়েক ঘণ্টা আগেই সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা করেছিল; তারপরও কার্যকর সুরক্ষা নেয়নি; পরে শতাধিক মানুষ দরবারে হামলা চালায়; পীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়; স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়; স্থানীয় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কথাও পুলিশের সূত্রে উঠে আসে। তাই একে ‘জনরোষ’ বললে সত্য ছোট হয়ে যায়।বরং সঠিক ভাষা হবে: এটি সুপরিকল্পিত সংঘবদ্ধ সামষ্টিক খুন। অর্থাৎ আইনের শাসনের অনুপস্থিতি। ভোটের রাজনীতির সাথে আপোষ। মব একটি চাদর-শব্দে পরিণত।
এই জায়গায় নৃবৈজ্ঞানিক একটি পার্থক্য জরুরি। নৃবিজ্ঞানের ভাষায়, মব কেবল উত্তেজিত ভিড় নয়; এটি অনেক সময় একটি moral performance—এমন এক সামষ্টিক পারফমেন্স, যেখানে কিছু মানুষ নিজেদের “নৈতিকভাবে বৈধ শাস্তিদাতা” বলে কল্পনা করতে শুরু করে। স্ট্যানলি জে. তাম্বিয়াহ দক্ষিণ এশিয়ার ‘জনরোষ’ নিয়ে দেখিয়েছিলেন, এ ধরনের সহিংসতা খুব কম ক্ষেত্রেই নিছক আকস্মিক; তা গুজব, প্রতীক, শত্রু-নির্মাণ, এবং সামষ্টিক উত্তেজনার মাধ্যমে প্রস্তুত হয়। বীণা দাস দেখিয়েছেন, সহিংসতা শুধু একটি ঘটনা নয়; তা দৈনন্দিন জীবনের ভেতরে ঢুকে স্বাভাবিকতার অর্থই বদলে দেয়। এই দৃষ্টিতে কুষ্টিয়া আলাদা কিছু নয়; এটি সেই ভয়ংকর মুহূর্ত, যখন নৈতিক ক্ষোভ বিচারকে সরিয়ে দেয়, আর সামষ্টিক উপস্থিতি ব্যক্তিগত দায়কে ঝাপসা করে।
এই কারণেই বলতে হয়: মব স্বতঃস্ফূর্ত নয়; মব তৈরি করা হয়। জনগণ যেমন তৈরি করা হয়, মবও তৈরি করা হয়। মবের প্রথম মঞ্চ রাস্তা নয়, পর্দা। খুনের আগে আসে ভাষা-দৃশ্য—“ও ভুল”, “ও বিপজ্জনক”, “ওদের শায়েস্তা করতে হবে”, “এটা থাকতে দেওয়া যাবে না।” তারপর আসে কাটা ভিডিও, পুরোনো ক্লিপ, উত্তেজক ক্যাপশন, মেসেঞ্জার-সার্কুলেশন, কমেন্টে রক্তলোলুপ প্রস্তৃতি। তারপর সেই ভাষা শরীরের ওপর নেমে আসে। এই অর্থে ডিজিটাল উসকানি কেবল মতপ্রকাশ নয়; তা অনেক সময় শাস্তির সামাজিক মহড়া। কুষ্টিয়ার ঘটনা সেই মহড়ার প্রকাশ্য ফল। পুরো সমাজের ক্ষমতা দখলের প্রাক-প্রস্তুতির শো ডাউন।
এখানেই “মবের কারখানা” কথাটি প্রাসঙ্গিক। মব কোনো বিমূর্ত আবেগ নয়; এটি একটি সামাজিক কারখানা। এখানে গুজব কাঁচামাল, ধর্মীয় শুদ্ধতার ভাষা জ্বালানি, সোশ্যাল মিডিয়া পরিবহনব্যবস্থা, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যবস্থাপক, আর প্রশাসনিক নীরবতা নিরাপত্তা-ছাতা। এই কারখানা শুধু ভিড় তৈরি করে না; তৈরি করে ভয়, দ্রুত নৈতিক উত্তেজনা, এবং শাস্তির বৈধতা। ফলে যে মানুষটি একা একা খুনি নয়, সে দলবদ্ধ অবস্থায় “ন্যায়রক্ষক” বলে নিজেকে কল্পনা করতে শেখে। সমাজ এভাবেই সামষ্টিকভাবে প্রশিক্ষিত খুনি তৈরি করে।
কুষ্টিয়া কেবল একজন মানুষকে হত্যার ঘটনা নয়। এটি মাজার সংস্কৃতির ওপর আঘাত। সরকার-উদ্ধৃত পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের পর ৪৪টি ঘটনায় অন্তত ৪০টি মাজার, সুফি কবরস্থান বা দরগাহ আক্রান্ত হয়েছে। পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোও দেখিয়েছে, এই ধারার মধ্যে ছিল ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং ভক্তদের ওপর হামলা। অর্থাৎ এটি বিচ্ছিন্ন নয়; একটি ক্রমবর্ধমান প্রকল্পের অংশ। মাজার এখানে শুধু ধর্মীয় স্থান নয়; এটি লোকঐতিহ্য, স্মৃতি, আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা, ওরস, গান, আখড়া, এবং ইসলামের একটি বহুত্ববাদী চর্চার কেন্দ্র। ফলে মাজারে হামলা মানে শুধু স্থাপনা ধ্বংস নয়; সংস্কৃতি দখল।
মাজারকে বোঝার জন্য আরও একটি নৃবৈজ্ঞানিক ধারণা সাহায্য করতে পারে। পিয়ের নোরার ভাষায়, মাজারকে স্মৃতির স্থান হিসেবে পড়া যায়। আর রবার্ট ওরসির লিভড রিলিজিয়ন ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্ম কেবল মতবাদ নয়; মানুষ কীভাবে যাতায়াত, ভক্তি, স্পর্শ, দোয়া, উৎসব, আশ্রয় এবং সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ধর্মকে বাঁচায়, তারও নাম। এই দৃষ্টিতে মাজারে হামলা কেবল ইট-পাথরের ওপর হামলা নয়; এটি মানুষের বেঁচে-থাকা ধর্ম, লোকায়ত আধ্যাত্মিকতা, এবং স্মৃতির ভূখণ্ডের ওপর আঘাত। তাই একে শুধু “ধর্মীয় মতভেদ” বললে কম বলা হয়; এটি নৈতিক কর্তৃত্ব, সাংস্কৃতিক বৈধতা এবং পাবলিক স্পেস দখলের লড়াইও। সেটিরও শো-ডাউন।
এখানেই আসে মবের অর্থনীতি। অর্থনীতি বলতে আমি শুধু টাকা বোঝাচ্ছি না; বোঝাচ্ছি নিয়ন্ত্রণ, জমি, আখড়া, অনুসারী, অনুদান, সামাজিক প্রভাব, এবং ভয়কে পুঁজি করার ক্ষমতা। মব শুধু কাউকে মারে না; মব জায়গা খালি করে, বৈধতা বদলায়, সাংস্কৃতিক মালিকানা পুনর্লিখে, এবং পাবলিক স্পেসে নতুন কর্তৃত্ব বসায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মব-সহিংসতায় অন্তত ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন; ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২৮। এই ধারাবাহিকতা কেবল আইনশৃঙ্খলার ভাঙন নয়; এটি এমন এক সমাজের লক্ষণ, যেখানে সহিংসতা শেখা যায়, ছড়ায়, এবং পুরস্কৃত হয়। মবের লাভ আছে—ভয় বসানো, প্রতিপক্ষকে চুপ করানো, সাংস্কৃতিক মালিকানা বদলানো, এবং স্থানীয় ক্ষমতাকে শক্ত করা।
এই জায়গায় একটি কঠিন সত্য উচ্চারণ করা দরকার: আগে ছিল রাষ্ট্রের ধমক “ক্রসফায়ার করে দেবে”, এখন হচ্ছে “মব করে দেবো”। এই বাক্য অলঙ্কার নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সহিংসতার রূপান্তরের ভাষা। একসময় বিচারবহির্ভূত শাস্তির প্রধান মুখ ছিল রাষ্ট্রের খোলা শক্তি। এখন সেই শাস্তির ভাষা সমাজে নেমে এসেছে—বা রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তির ছায়ায় সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে শাস্তির কেন্দ্র একক নয়; বহু-মাথাওয়ালা। কিন্তু ফল এক: আইনকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত দমন। এই পরিবর্তন ভয়ংকর, কারণ এতে সহিংসতা শুধু প্রতিষ্ঠানিক থাকে না; সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়। এটি রাষ্ট্রের জন্যও বিপজ্জনক, কারণ একবার রাস্তার বিচার বৈধতা পেলে আইন নিজের মর্যাদা হারায়। অর্থাৎ সামষ্টিক খুনের জন্য তৈরি অনেক সদস্য এখন আমাদের আশেপাশেই।
আরও ভয়ংকর হলো, খুনের পরও শাসন শেষ হয় না। দাফন, কবর, মাজার, স্মৃতি—এসবও নিয়ন্ত্রণের বিষয় হয়ে ওঠে। একজন মানুষকে হত্যা করাই যথেষ্ট নয়; কোথায় তাঁকে দাফন করা হবে, তাঁর দরবার টিকে থাকবে কি না, তাঁর স্মৃতি বৈধ কি না—এসব নিয়েও লড়াই শুরু হয়। অর্থাৎ সহিংসতা মৃত্যুতে শেষ হয় না; মৃত্যুর পরও শাসন চালাতে চায়। খুনিরা শুধু শরীরের ওপর নয়; শোক, কবর, স্মৃতি, মাজার—সবকিছুর ওপর কর্তৃত্ব চায়। এই কারণেই মাজারে হামলাকে শুধু অপরাধ হিসেবে নয়, স্মৃতি-রাজনীতির অংশ হিসেবেও পড়তে হবে। Nora–র স্মৃতি-ধারণা এই দিকটি বোঝাতে বিশেষভাবে কার্যকর।
এখানে রাষ্ট্রের প্রশ্ন এড়ানো যায় না। আনু মুহাম্মদ লিখেছেন, মব-সন্ত্রাসের বিচার না হলে ধরে নিতে হবে কোথাও না কোথাও সমর্থন, প্রশ্রয়, অথবা অন্তত ভয়ংকর নমনীয়তা আছে। শাহবাগ ও কুষ্টিয়ার হামলাকে তিনি পরিকল্পিত বলেছেন; পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, আগের হামলার বিচার না হওয়া, এবং একই ধরনের গোষ্ঠীর পুনরাবির্ভাব—এসবকে দায়মুক্তির পরিবেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক মত নয়; সাম্প্রতিক ঘটনাপরম্পরাও সেটির দিকে ইঙ্গিত করে। কারণ যখন রাষ্ট্র সহিংসতার আগে ও পরে কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করতে ব্যর্থ হয়, তখন আইনের শূন্যস্থানে মব নিজের বৈধতা তৈরি করে আর রাষ্ট্রের বৈধতা কমাতে থাকে।
তবু একটি আত্মসমালোচনামূলক কথা না বললে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থাকবে: আমরাই মব—যদি আমরা পোস্টে উসকানি দিই, কমেন্টে খুনের নৈতিকতা বানাই, দ্রুত বিচারের আনন্দে ভাসি, “একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার” ধরনের ভাষাকে স্বাভাবিক করি, আর প্রকাশ্য খুনে অবাক হওয়া বন্ধ করি। মব সবসময় বাইরে থেকে আসে না; সমাজের ভাষায়, রসবোধে, ঘৃণায়, নীরবতায়, এবং তাড়াহুড়ো করে শাস্তি দেওয়ার বাসনায় মবের বীজ থাকে। সেই বীজ না ভাঙলে শুধু খুনিদের বিচার যথেষ্ট নয়।
শেষ কথা তাই সরল কিন্তু কঠিন। মব নয়, এটি সুপরিকল্পিত সংঘবদ্ধ সামষ্টিক খুন। এর পেছনে আছে ডিজিটাল উসকানি, ধর্মীয় বৈধতার ভাষা, দখল অর্থনীতি, সংস্কৃতি-নিয়ন্ত্রণের বাসনা, এবং রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তির ফাঁক। বিচার না হলে এই কারখানা আরও দক্ষ হবে। ভাষাগত স্পষ্টতা তাই রাজনৈতিক কাজ: এটি জনরোষ নয়; এটি পরিকল্পিত শাস্তির নামে সংঘবদ্ধ খুন। আর এর জবাব শুধু নিন্দায় নয়—আইনে, বিচারে, সামাজিক প্রতিরোধে, এবং সেই ভাষাকে ভাঙায়, যেখান থেকে মবের জন্ম। মবের জবাব মব নয়। রাষ্ট্রের জবাবও মব হওয়া চলবে না। নইলে শেষ পর্যন্ত আইনও হারাবে, সমাজও হারাবে, মানুষও হারাবে। মব কারখানায় স্বাগতম।
লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও শিক্ষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
তথ্যসূত্র
Tambiah, S. J. (1997). Leveling Crowds: Ethnonationalist Conflicts and Collective Violence in South Asia. University of California Press.
Das, V. (2007). Life and Words: Violence and the Descent into the Ordinary. University of California Press.
Nora, P. (1989). Between Memory and History: Les Lieux de Mémoire. Representations, 26, 7–24.
Orsi, R. A. (2010). The Madonna of 115th Street. Yale University Press.
Prothom Alo English. (2026, April 13). Old video spread from 7 IDs before mob attack on shrine.
Prothom Alo English. (2026, April 11). ‘Pir’ beaten to death in Kushtia; shrine vandalised and set on fire.
Prothom Alo English. (2026, April 12). Mob violence reemerges as perpetrators not brought to justice.
The Daily Star. (2025, January 19). 40 shrines attacked in over 5 months.
The Daily Star. (2025, February 22). Silence of the shrines.
The Daily Star. (2026). Mob violence now alarmingly routine.
Dhaka Tribune. (2025, December 31). ASK: 197 killed in mob violence in 2025, Dhaka tops list.
Dhaka Tribune. (2026, February 6). We need to eliminate mob killings.
Dhaka Tribune. (2026, January 1). Govt initiatives fall short as mob violence, human rights abuses rise.
Prothom Alo English. (2026, April). Anu Muhammad’s op-ed on mob violence and impunity.

