তবে কি মেহেরপুরে ফিরে আসছে চরমপন্থা

একসময় বাংলাদেশের চরমপন্থী রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত অঞ্চল। ১৯৬৭ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়িতে কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বে সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্বাধীনতার পর এই অঞ্চলে গড়ে ওঠে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, যা পরবর্তীতে নিষিদ্ধ করে সরকার। ১৯৭৩-৭৬ সালের মধ্যে কয়েক ভাগে বিভক্ত পড়ে সংগঠনটি। তবে মেহেরপুরে সক্রিয় ছিল পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) হক গ্রুপ।
অন্যদিকে গাংনী-কুষ্টিয়ায় গড়ে ওঠে শ্রমজীবী মুক্তি আন্দোলন ও জাসদের গণবাহিনী। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের অস্ত্র ও সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে দ্রুত সহিংস তৎপরতা বিস্তার করে এসব সংগঠন। ৮০ ও ৯০ এর দশকে আদর্শিক লড়াই ছাপিয়ে ক্ষমতা ও অর্থের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে তারা। ছোট ছোট সশস্ত্র ইউনিটে বিভক্ত হয়ে শুরু হয় অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও টার্গেট কিলিং। লাল্টু, রুহুল, সবুজ, সিরাজ, বাবলু বিশ্বাসসহ একাধিক নাম ছিল সে-সময়ের আলোচনায়। সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে আতঙ্ক। তখন সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়া মানেই ঝুঁকি। তবে ৮০ ও ৯০-এর দশকে বদলাতে শুরু করে দৃশ্যপট।
নিজেদের প্রয়োজনে চরমপন্থীদের ব্যবহার করতে শুরু করেন মূলধারার রাজনৈতিক দলের নেতারা। আদর্শের জায়গা দখল করে নেয় ক্ষমতা ও অর্থের লড়াই। বড় সংগঠনগুলো ভেঙে হয় ছোট ছোট। নিজস্ব অস্ত্র ও নিয়ন্ত্রণের এলাকা নিয়ে হয়ে প্রতিটি দলই গড়ে তোলে আলাদা কমান্ড ইউনিট। নিজেদের মধ্যেই চলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। এই সময় মেহেরপুরে একের পর এক নাম আলোচনায় আসে। নামগুলো হলো, লাল্টু, রুহুল, সবুজ, সিরাজ, আকু, হামিদ, বাবলু, ঈমান, আনারুল ইসলাম, বাবলু বিশ্বাস এবং আমাম হোসেন মিলু। লাল্টু গ্রুপ ‘লাল পতাকা’ নাম ব্যবহার করলেও তাদের লক্ষ্য ছিল কৃষিজমি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ। রুহুল গড়ে তোলেন সীমান্তভিত্তিক চলাচল ও অস্ত্র সরবরাহ নেটওয়ার্ক। সবুজ প্রতিষ্ঠা করেন আধুনিক চাঁদাবাজির জাল। যার সঙ্গে ছিল স্থানীয় রাজনীতির গোপন সংযোগ। রুহুল ও সবুজের ভগ্নিপতি আনারুল ইসলাম দেখতেন মাঠপর্যায়ে সদস্য সংগ্রহ ও তথ্য নেটওয়ার্কের বিষয়টি। বাবলু বিশ্বাস পরিচিত ছিলেন টার্গেট কিলিংয়ের জন্য, প্রতিপক্ষ নির্মূলই ছিল তার প্রধান কৌশল। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে অস্ত্রভাণ্ডারের কথা প্রকাশ্যে এনে আবারও আলোচনায় আসেন তিনি।
আর আমাম হোসেন মিলু ছিলেন সমন্বয়কারী। অর্থ, অস্ত্র ও সংঘর্ষ পরিচালনায় ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এই এলাকায় চরমপন্থার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক ছিল নির্মমতা। প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, অপহরণ, গুম, জবাই এমনকি ইটভাটায় জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো ঘটনাও ঘটেছে তখন। চাঁদাবাজি, মুক্তিপণ আর অস্ত্রের মহড়া ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। নিজেদের মধ্যেই আধিপত্য বিস্তারে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ লেগে থাকত। এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনেও। ব্যবসায়ী ও কৃষকরা থাকতেন চাঁদার আতঙ্কে। অপহরণের ভয় হয়ে ওঠে নিত্যসঙ্গী।
১৯৯৬ সালের পর থেকে চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান। শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার-নিহত হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দুর্বল হয়ে পড়ে সংগঠনগুলো। ২০০০ সালের পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। অপরাধীদের অনেকে আত্মসমর্পণ করে ফেরেন স্বাভাবিক জীবনে। কেউ কেউ আবার শুরু করেন মূলধারার রাজনীতি। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২১ মে উল্লাপাড়ায় ৭ জেলার ৩১৫ জন চরমপন্থীর আত্মসমর্পণ এই প্রক্রিয়াকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
পাবনায় নিষিদ্ধ সংগঠনের পোস্টার ও দেয়াল লিখন, মেহেরপুরের গাংনীতে হুমকি সম্বলিত চিরকুট ও বোমা, মুজিবনগরে অপহরণ এবং পুলিশের ওপর ককটেল হামলার ঘটনায় পুরনো নেটওয়ার্ক আবার সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কায় স্থানীয়রা। তবে পুলিশের দাবি, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা, সংগঠিত চরমপন্থার পুনরুত্থান নয়। তাদের মতে, নজরদারি জোরদার রয়েছে এখনও। জেলায় পুনরায় বড় আকারে চরমপন্থা ফিরে আসার সম্ভাবনা কম।
তবে অতীত অভিজ্ঞতা দিচ্ছে ভিন্ন ইঙ্গিত। অতীতে আত্মসমর্পণের পরও অনেকেই ফিরেছে পুরনো পেশায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেহেরপুর সদর উপজেলায় যেসব চরমপন্থী বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জীবিত, তাদের সংখ্যা ২২ জনের মত। তারা হলেন, মো. সুবাদ আলী (সুবা), মো. সোনা মিয়া (সোনা), মো. সাবেদ আলী শেখ, মো. সাগর আলী শেখ, আজেপ শেখ, আ. সামাদ, মো. রইচুল ইসলাম, আ. খালেক, হামিদুল ইসলাম (হামিদ), মো. খোকন, মো. শাহজাহান মালিথা, সাইদুর রহমান (সাজু), হামিদুল ইসলাম (দ্বিতীয়), খন্দকার শাহিন, মো. মকবুল, মো. আমিরুল ইসলাম, মো. ইমরান, খন্দকার শফিক, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আরিফুল ইসলাম, মো. ইমাম এবং খালেক। এরকম মোট তিনটি হালনাগাদ তালিকা মেহেরপুরের তিনটি থানার কাছে রয়েছে বলে জানাচ্ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়, মেহেরপুরে চরমপন্থা কি অতীত, নাকি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে আবারও? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উত্তর নির্ভর করছে কার্যকর নজরদারি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সচেতনতার ওপর। মেহেরপুরের পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায়ের দাবি, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জেলায় চরমপন্থীদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। অনেকেই সাধারণ জীবনে ফিরে গেছেন, কেউ কেউ মারা গেছেন, আর জীবিতদের একটি অংশ মূলধারার রাজনীতিতে হয়েছেন থিতু।
শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কারণে বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে জানাচ্ছিলেন পুলিশের এ কর্মকর্তা। চরমপন্থায় জড়িতদের হালনাগাদ তালিকা সংরক্ষণ করে তাদের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় তাদের পুনরায় সেই পথে ফেরার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

