মিলনায়তন বরাদ্দে শিল্পকলার ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ আচরণ, ক্ষুব্ধ নাট্যকর্মীরা
- বরাদ্দকৃত মিলনায়তন হুট করে বাতিল, ক্ষতিপূরণ চায় তাড়ুয়া
- ‘আদিষ্ট হয়ে’ বরাদ্দ বাতিল, দুঃখপ্রকাশ শিল্পকলার

গত মার্চ মাসে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মিলনায়তনটি তিন দিনের জন্য বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছিল নাট্যদল ‘তাড়ুয়া’। ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ নামে একটি যুদ্ধবিরোধী নাটক মঞ্চায়নের কথা ছিল তাদের। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এপ্রিলের ২২, ২৩ ও ২৪ তারিখ বরাদ্দ দেওয়া হয় তাদের। সে অনুযায়ী নাটকের মহড়া, দর্শকের কাছে টিকিটও বিক্রি করেছে নাট্যদলটি। তবে রবিবার কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই জানিয়ে দেওয়া হয়, ২৩ এপ্রিল মিলনায়তনটির বরাদ্দ করা হয়েছে বাতিল।
তাড়ুয়াকে দেওয়া চিঠিতে শিল্পকলা বলেছে, ‘অনিবার্য কারণবশত ২৩ এপ্রিল নাট্য সংগঠন (তাড়ুয়া)-এর অনুকূলে প্রশাসনিক অনুমোদনক্রমে আদিষ্ট হয়ে জাতীয় নাট্যশালার মূল হল চূড়ান্ত বরাদ্দ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না বিধায় আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’ এমন ঘটনা কেবল তাড়ুয়ার সঙ্গে নয়; সাম্প্রতিক সময়ে আরও কয়েকটি নাট্যদল ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে করেছে শিল্পকলার প্রশাসন।
থিয়েটার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে হুট করে মিলনায়তন বরাদ্দ বাতিল করার চর্চা সামগ্রিকভাবে দর্শক বিচ্ছিন্ন করবে দেশের নাট্যচর্চাকে। মুক্তিযুদ্ধের পর টিকিটের বিনিময়ে নিয়মিত নাট্যচর্চার যে গর্ব করার মতো একটি অবস্থান তৈরি হয়েছে, তাও হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত।
নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের ভাষ্য, ‘এভাবে হুট করে মিলনায়তন বরাদ্দ বাতিল করা হলে নষ্ট হয় দর্শকের অভ্যস্ততা। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আর্থিক লোকসানসহ পড়ে নানা জটিলতায়। কোনোভাবেই কাম্য নয় এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ।’ গত ১৪-১৬ এপ্রিল আরণ্যক নাট্যদলকেও মিলনায়তন বরাদ্দ দিয়ে তা বাতিল করার তথ্যও যোগ করেন মামুনুর রশীদ।
‘পহেলা বৈশাখে আরণ্যক প্রযোজিত ‘কম্পানি’ নাটকের প্রদর্শনীর জন্য বরাদ্দ নিয়েছিলাম মিলনায়তন। পরে আমাদের জানানো হয়, নিজেরাই নববর্ষের অনুষ্ঠান করবে শিল্পকলা। বাতিল করা হয় আমাদের দেওয়া বরাদ্দ। পরের মাসে আমাদের মিলনায়তন বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে জানানো হয়,’ বলছিলেন মামুনুর রশীদ।
শিল্পকলার কাছে ব্যাখ্যা ও ক্ষতিপূরণ দাবি
তাড়ুয়া নাট্যদলের প্রধান ও ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ নাটকের নির্দেশক বাকার বকুল আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমাদের নাটকটিতে ব্যবহার করা হয় বড় ক্যানভাসের সেট। যার জন্য দরকার হয় বেশি সময় কারিগরি মহড়া। আমরা কারিগরি মহড়া করব ২২ এপ্রিল। আর ২৩ ও ২৪ এপ্রিল নাটকের প্রদর্শনীর জন্য দর্শকের কাছে টিকিট বিক্রি করেছি। কিন্তু প্রদর্শনীর মাত্র তিন দিন আগে ২৩ এপ্রিলের বরাদ্দ কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই করা হয় বাতিল।’
‘এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এবং সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আগে টিকিট নেওয়া দর্শকের সঙ্গে। এমন সিদ্ধান্ত শুধু একটি দলের ক্ষতি নয়; এটি এরই মধ্যে সংকটে থাকা নাট্যশিল্প ও দর্শক-সংস্কৃতির জন্যও ক্ষতিকর। জাতীয় নাট্যশালা, যা নাট্য প্রদর্শনের জন্য নির্ধারিত, সেখানে এভাবে নির্ধারিত সূচি বাতিল হওয়া অগ্রহণযোগ্য’—বলছিলেন বাকার বকুল। এ ঘটনার জন্য সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির দায়ভার শিল্পকলা একাডেমির ওপর বর্তায় উল্লেখ করে শিল্পকলার কাছে যথাযথ ব্যাখ্যা, প্রতিকার এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন তিনি।
২৩ এপ্রিল নাটকটি দেখার জন্য অগ্রিম টিকিট কিনেছিলেন নাট্যজন অলোক বসু। হতাশা প্রকাশ করে আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘দুঃখপ্রকাশ করে আমাকে ২৪ তারিখ নাটক দেখতে বলেছে তাড়ুয়া। আমি পরদিন দেখব নাটকটি। তবে শিল্পকলার এমন দায়িত্বহীন আচরণ সামগ্রিক নাট্যচর্চার জন্য ক্ষতিকর। অনেক দর্শকই হয়তো নাটক থেকে বিচ্ছিন্ন হবেন এমন স্বেচ্ছাচারী আচরণে।’
থিয়েটারবিষয়ক পত্রিকা ক্ষ্যাপার নির্বাহী সম্পাদক ও নাট্যকার অপু মেহেদীর ভাষ্য, ‘শিল্পকলা এভাবে হুট করে মিলনায়তন বরাদ্দ বাতিল করলে অবশ্যই কারণ ব্যাখ্যা করে প্রকাশ্যে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া উচিত এবং সংশ্লিষ্ট দলকে দেওয়া উচিত অন্তত তিন গুণ আর্থিক ভর্তুকি।’
‘টাকা দিয়ে মিলনায়তন বরাদ্দ নেওয়ার পর শিল্পকলা ইচ্ছামতো, যখন খুশি বরাদ্দ বাতিল করতে পারে না। বিশেষ কোনো কারণে বরাদ্দ বাতিল করা হলে তার ব্যাখ্যাও জনসমক্ষেই দেওয়া উচিত। কারণ যে দর্শক টিকিট কিনেছেন, তারও জানার অধিকার আছে—কেন নাটকের প্রদর্শনীটি বাতিল হলো?’, বলছিলেন অপু মেহেদী।
নাট্যদল তাড়ুয়া জানিয়েছে, দর্শকরা ২৩ এপ্রিল নাটকটি দেখার জন্য টিকেট কিনেছিলেন, তাদের কাছে করা হয়েছে দুঃখপ্রকাশ। ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে টিকিটের টাকাও।
মাঝপথেও অনুষ্ঠান বন্ধ করেছে শিল্পকলা
এর আগে গত ১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পথ মূকাভিনয় পরিষদের সম্মেলন অনুষ্ঠান মাঝপথে বন্ধ করে দিয়েছিল শিল্পকলা একাডেমি। পথ মূকাভিনয় পরিষদ তখন এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিল, শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে দুদিনব্যাপী সম্মেলন ও জাতীয় পথ মূকাভিনয় উৎসব শুরু হয় সকাল সাড়ে ৯টায়। অনুষ্ঠান শুরুর দেড় ঘণ্টার মাথায় বেলা ১১টায় অনুষ্ঠান স্থগিত ঘোষণা করে শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ।
ওই সম্মেলনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুর, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছিলেন ২০টি সংগঠনের প্রতিনিধিরা। উপস্থিত দলগুলোর মধ্যে ছিল—প্যান্টোমাইম মুভমেন্ট, সাইলেন্ট থিয়েটার, নাট্যতরী, মুক্ত বিহঙ্গ, প্রদীপ্ত প্যান্টোমাইম, মুক্তমঞ্চ নির্বাক দল, মাইমো টেলস, মাইম ফর চিলড্রেন, মাইম ফেইস, নিমজ্জন, নওগাঁ মাইম থিয়েটার, স্বাপ্নিক ও পুরাণ।
তাড়ুয়াকে দেওয়া মিলনায়তন কেনো বাতিল করা হয়েছে—জানতে সোমবার শিল্পকলার মিলনায়তন বরাদ্দ কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি তাদের কেউই।
শিল্পকলার নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের একজন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন, তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে আদেশ পেয়ে তাড়ুয়াকে জানিয়েছেন এই সিদ্ধান্ত। ওই দিন অন্য একটি অনুষ্ঠান হবে মিলনায়তনে। সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে নাট্যশালা মিলনায়তনে নাটক ছাড়াও হচ্ছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। এটি জাতীয় নাট্যশালার নীতিমালা লঙ্ঘন করে বলেও জানিয়েছেন শিল্পকলার একাধিক কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে কথা বলতে শিল্পকলার মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের ভাষায়, ‘জাতীয় নাট্যশালা তৈরিই হয়েছে নাটকের বিকাশের জন্য। নাটকসংশ্লিষ্ট ছাড়া অন্য অনুষ্ঠান করার জন্য শিল্পকলায় চিত্রশালা, সংগীত ভবনে মিলনায়তন আছে। তবুও নাট্যশালায় অন্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলে নষ্ট হয় নাট্যচর্চার স্বাভাবিক গতিশীলতা। এটি করা ঠিক নয়।’

