এমপি হওয়ার মতো যোগ্য নেত্রী নেই চট্টগ্রাম বিএনপিতে!

জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনীত ৩৬ প্রার্থীর মধ্যে চট্টগ্রামের শুধু একজন। সবেধন নীলমণি এই নারী হলেন বিএনপির সাবেক হুইপ প্রয়াত সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা। বাড়ি চট্টগ্রামে হলেও তিনি এখানকার রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না কখনো।
চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপির যেসব নারীনেত্রী মাঠে ছিলেন সক্রিয়, মনোনয়ন না পেয়ে তারা বিস্মিত, হতাশ ও ক্ষুব্ধ। শাকিলা ফারজানাসহ চট্টগ্রাম থেকে বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন ৩৬ জন।
আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান রাখলেও সংসদ সদস্য হওয়ার মতো যোগ্য নেত্রী চট্টগ্রামে পাওয়া যায়নি বলে জানালেন দলটির সিনিয়র এক নেতা।
‘মাঠে আন্দোলন, হরতাল-অবরোধ করা এক কথা আর সংসদে গিয়ে ভূমিকা রাখা ভিন্ন বিষয়। যিনি সংসদ সদস্য হবেন, তাকে ফুলফিল করতে হয় বিভিন্ন ক্রাইটেরিয়া। পাবলিকের কাছে লাগে গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি। হতে হবে শিক্ষিত ও মার্জিত। সংসদীয় রীতিনীতি সম্পর্কে থাকতে হবে ধারণা। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, চট্টগ্রামে এ রকম যোগ্য কাউকে পাওয়া যায়নি’- বলছিলেন তিনি।
‘আওয়ামী লীগের আমলে আমাকে জঙ্গি অর্থায়নের সাজানো মামলার আসামি করে নির্যাতন করা হয় জেলে নিয়ে। এরপরও আমি করিনি নতি স্বীকার। আমি মনে করি, এজন্য দল আমাকে করেছে মূল্যায়ন’
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টি। প্রতি ছয়জন সংসদ সদস্যের বিপরীতে একটি হিসেবে বিএনপি জোটের সংরক্ষিত নারী আসন ৩৬টি। আজ সোমবার বিএনপি দলীয়ভাবে নাম ঘোষণা করে ৩৬ জন মনোনীত প্রার্থীর।
চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি এই তিনটি সাংগঠনিক জেলা থেকে একজনও নেই প্রার্থী তালিকায়।
শাকিলা ফারজানা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সুপ্রিম কোর্ট ইউনিটের সদস্য। আওয়ামী লীগের আমলে তিনি সুপ্রিম কোর্টে সক্রিয় ছিলেন আইনজীবী রাজনীতিতে। ২০১৬ সালে জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে তার নামে হয় দুটি মামলা। তাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। প্রায় দুই বছর জেল খেটে বেরিয়ে দেশ ছাড়েন তিনি। ফিরে আসেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি খালাস পেয়েছেন মামলাগুলো থেকে।
শাকিলার বাবা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম ছিলেন চট্টগ্রামের হাটহাজারী আসন থেকে পাঁচবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। দুই দফায় পালন করেন হুইপের দায়িত্ব। ওই আসন থেকে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন শাকিলা। মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হওয়া ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এখন পালন করছেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
সরাসরি নির্বাচনে মনোনয়ন না পেলেও সংরক্ষিত হিসেবে সংসদে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন শাকিলা ফারজানা, ‘দল আমাকে সম্মানিত করেছে। আমি অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করব দলের মর্যাদা। দল আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, সেই দায়িত্ব যেন সুন্দর ও পালন করতে পারি সঠিকভাবে, সেজন্য দোয়া কামনা করছি জনগণের কাছ থেকে।’
‘আওয়ামী লীগের আমলে আমাকে জঙ্গি অর্থায়নের সাজানো মামলার আসামি করে নির্যাতন করা হয় জেলে নিয়ে। এরপরও আমি করিনি নতি স্বীকার। আমি মনে করি, এজন্য দল আমাকে করেছে মূল্যায়ন,’যোগ করেন তিনি।
শাকিলা ফারজানা ছাড়া দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী চট্টগ্রামের নেত্রীদের মধ্যে আছেন, মহানগর মহিলা দলের সভাপতি মনোয়ারা বেগম মনি, আফরোজা বেগম, মোছাম্মৎ শাহেনেওয়াজ চৌধুরী, এসএম নুসরাত ইকবাল, নাছিমা আক্তার চৌধুরী, আইরীন পারভীন খন্দকার, ফরিদা আকতার, ডা. কামরুন নাহার, ড. নাছিমা ইসলাম চৌধুরী বৃষ্টি, রীনা আকতার, দিল আফরোজ সুলতানা চৌধুরী, নাজমা আকতার, জিনাতুন নেছা জিনু, ইয়াসমিন খান, ডা. লুসি খান, অ্যাডভোকেট হাসনা হেনা, আয়শা আকতার সানজি, সায়মা আহমেদ, নাসিমা সাফা কামাল, বিবি হাজেরা সাদাত আলম, জান্নাতুল নাঈম চৌধুরী রিকু, নাজনীন মাহমুদ, জেলী চৌধুরী, গোলতাজ বেগম, অ্যাডভোকেট কানিজ কাউসার চৌধুরী, মাহমুদা সুলতানা চৌধুরী ঝর্ণা, ডা. ফারাহনাজ মাবুদ সিলভী, নুরী আরা সাফা, মেহেরুন নেছা নার্গিস, ফারহানা ইয়াছমিন চৌধুরী আঁখি, মোছাম্মৎ সুলতানা বেগম আঁখি সুলতানা, রৌশন আখতার, সুলতানা পারভীন, ডা. ফারহানা আফরোজ চৌধুরী ও জেসমিনা খানম।
তাদের গত ১৮ এপ্রিল ঢাকায় ডেকে সাক্ষাৎকার নেয় দলের পার্লামেন্টারি বোর্ড। মনোনয়ন না পাওয়া কয়েকজন দলের সিদ্ধান্ত নিয়ে জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া।
চট্টগ্রামের নেতাদের গ্রুপিং রাজনীতির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন নগর মহিলা দল নেত্রী আঁখি সুলতানা। ‘আমি ছিলাম প্রয়াত নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান সাহেবের কর্মী। এরপর রাজনীতি করেছি মেয়র শাহাদাত সাহেবের সঙ্গে। এটা পছন্দ করেন না আমাদের অনেক সিনিয়র নেতা।’
‘শুনেছি, গত রাত ১২টা পর্যন্ত মনোনয়নের তালিকায় নাম ছিল আমার। চট্টগ্রামের এক সিনিয়র নেতা তালিকা থেকে বাদ দেন আমার নাম। নেতারা নিজেরা গ্রুপিং করতে গিয়ে বলি দিয়েছেন আমাদের। চট্টগ্রাম মহানগরের মতো একটি লড়াকু ইউনিট থেকে একজন নারীও হতে পারলেন না এমপি, এটা আমাদের লজ্জা না। চট্টগ্রামের সব নেতা, মন্ত্রী-এমপিদের লজ্জা’ উল্লেখ করেন তিনি।
যোগ্যতার অভাব-সংক্রান্ত এক বিএনপি নেতার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বললেন, ‘আমি করেছি ছাত্রদল। পাস করেছি মাস্টার্স। কমপ্লিট করেছি এলএলবি। তিন বছর করেছি সাংবাদিকতা। করি লেখালেখি। রাজনীতি করতে গিয়ে হয়েছি মামলার আসামি, জেলে গেছি, রাস্তায় পুলিশের সঙ্গে করেছি মারামারি। কিন্তু কারও সঙ্গে অভদ্র কিংবা অমার্জিত আচরণ করেছি বলে বলতে পারবে না কেউ। যে নেতা প্রশ্ন তুলেছেন যোগ্যতার, তার কী যোগ্যতা আছে জানি না।’
মনোনয়নের তালিকা পাওয়ার পর থেকে মানসিক অবস্থা ভালো নেই জানিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মনোয়ারা বেগম মনি বললেন, ‘যারা ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, তারা মনোনয়ন পেলে ভালো লাগত। মহানগরের মতো একটা ইউনিটকে দেওয়া হয়েছে বাদ। লাগছে কষ্ট। তারপরও দল যেটা মনে করেছে ভালো, সেটাই করেছে। যারা মনোনয়ন পেয়েছেন সবাইকে অভিনন্দন।’
সাবেক কাউন্সিলর জেসমিনা খানম দলের এই মনোনয়নে বিস্মিত ও হতাশ। ‘বিএনপির নীতিনির্ধারক চট্টগ্রামের নেতারা যেভাবে চেয়েছেন হয়েছে সেভাবেই। দলের দুঃসময়ের ত্যাগী কর্মীদের জন্য এটা খুবই হতাশার।’
দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে জানালেন, ‘বিএনপি যখন ২০০৯ সালের নির্বাচনে হেরে যায়, সেই কঠিন সময়ে আমি দলে যোগ দিই। সবাই যোগ দেন সরকারি দলে আর আমি যোগ দিয়েছিলাম বিরোধী দলে। ১৫ বছর ছিলাম রাজপথে। হয়েছি মামলার আসামি, হয়েছি গ্রেপ্তার।’
পার্লামেন্টারি বোর্ড সর্বসম্মতভাবে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। প্রার্থী বাছাই করা তো একক কোনো নেতার কাজ নয়। সবাই মিলে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, অবশ্যই দলের জন্য নিয়েছেন মঙ্গলজনক সিদ্ধান্তই। চট্টগ্রাম থেকে আরও কেউ মনোনয়ন পেলে অবশ্যই খুশি হতাম। কিন্তু যিনি পেয়েছেন, তিনিও অযোগ্য কেউ নন। আশা করি যারা মনোনয়ন পাননি, ভবিষ্যতে দল মূল্যায়ন করবে তাদের’- বলছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান।

