ট্রাম্পের পরবর্তী নিশানা কে?

ডোনাল্ড ট্রাম্প
আন্তর্জাতিক আইনে কোনো রাষ্ট্র কি অন্য দেশের প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যেতে পারে? ভেনেজুয়েলায় গত ৩ ফেব্রুয়ারি হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় আটক হন দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। এরপরই উঠেছিল এমন প্রশ্ন। তবে এসব প্রশ্নের তোয়াক্কা করেননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাই ব্রুকলিন কারাগার থেকে নিউ ইয়র্কের আদালতে চক্কর কাটছেন সস্ত্রীক মাদুরো।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করে তারা। শুধু খামেনি নন, একের পর এক হামলায় নিহত হন দেশটির শীর্ষ নেতারা। এসব হামলা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হলেও বরাবরের মতো তোয়াক্কা করেননি ট্রাম্প।
এখন প্রশ্ন উঠেছে— ভেনেজুয়েলা ও ইরানের পর ট্রাম্পের পরবর্তী নিশানা কে?
ভেনেজুয়েলা থেকে মাদুরোকে তুলে আনার পর থেকেই ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, কিউবার শাসনব্যবস্থা পতনের মুখে। তিনি বলেছেন, ভয়াবহ পরিণতি এড়াতে দেশটিকে পৌঁছাতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে।
এই সপ্তাহের শুরুতে হোয়াইট হাউজের বাইরে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প কিউবাকে আখ্যা দেন ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে। উল্লেখ করেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কথা। এতে বোঝা যাচ্ছে, হাভানার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি মোড় নিতে পারে আরও কঠোর অবস্থানের দিকে। তার এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্কের আগের কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন। ট্রাম্পের বক্তব্য স্পষ্ট, নিজের সামরিক শক্তিকে অজেয় মনে করেন তিনি। ইরান অভিযান শেষ হলেই হাভানার সরকারকে পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন।
লক্ষ্য কমিউনিস্ট শাসন
ফিদেল কাস্ত্রো সিয়েরা মায়েস্ত্রা থেকে হাভানায় প্রবেশের প্রায় ৭০ বছর পেরিয়েছে। এই দীর্ঘ সময় পরও কিউবার কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটানো ট্রাম্প ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও— উভয়েরই দীর্ঘদিনের লক্ষ্য। মিয়ামির কট্টর কাস্ত্রোবিরোধী পরিবেশে বেড়ে ওঠা কিউবান অভিবাসীদের সন্তান রুবিওর জন্য এটি ব্যক্তিগত বিষয়ও বটে। দক্ষিণ ফ্লোরিডার বহু কিউবান নির্বাসিত এবং রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের কাছেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা।
ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক সহায়তা হারানোর পর কিউবার সরকার আর টিকে থাকতে পারবে না। তাই ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো না কোনো সমঝোতায় যেতে তারা আগ্রহী। তিনি প্রথমবারের মতো জানান, এই আলোচনায় তিনি নিজেও যুক্ত আছেন, যদিও তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন রুবিও। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম জানিয়েছে, কিউবার পক্ষে এসব আলোচনায় প্রতিনিধিত্ব করছেন রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল রদ্রিগেজ কাস্ত্রো।
কিছুদিন আগে ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নাল দাবি করেছিল, ট্রাম্পকে সরাসরি চিঠি পাঠিয়েছিলেন রদ্রিগেজ। তবে শেষ পর্যন্ত সে চিঠি পৌঁছায়নি গন্তব্যে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চিঠিতে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কিউবার জন্য অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ চুক্তির, পাশাপাশি জানানো হয় নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আহ্বানও।
দেশ ভিন্ন, কৌশল এক
ট্রাম্প কোনো সময়ই কিউবায় শাসন পরিবর্তনে বলপ্রয়োগের কথা উল্লেখ করেননি। বরং তিনি বারবার বলেছেন, এর প্রয়োজন হবে না। কারণ অর্থনৈতিকভাবে এতটাই দুর্বল যে আরেকটি ধাক্কা সহ্য করতে পারবে না দেশটি।
এদিকে, তিনি ধীরে ধীরে কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মধ্যে সংযোগ তৈরির পদক্ষেপও নিচ্ছেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি অনুমতি দেন কিউবার বেসরকারি খাতে ডিজেলের মতো মার্কিন জ্বালানি সরবরাহের। যদিও ছয় দশকের বেশি সময় ধরে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে দেশটির ওপর।
একই সময়ে মার্কিন বিচার বিভাগ কিউবার সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ফেডারেল অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গঠন করেছে একটি টাস্কফোর্স। অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থা এতে যুক্ত থাকবে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ট্রাম্প প্রশাসন বিবেচনা করছে নতুন নিষেধাজ্ঞার কথা।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও একই কৌশল নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। গত বছর নিকোলাস মাদুরোসহ তার সরকারের কয়েকজন সদস্যকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে তারা ট্রেন দে আরাগুয়া ও সিনালোয়া কার্টেলের মতো অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে মাদক পাচার করছে যুক্তরাষ্ট্রে। সে সময় মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি বলেছিলেন, ‘মাদুরো বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মাদক পাচারকারীদের একজন এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।’
ট্রাম্পের পাশে লাতিন মিত্ররা
ট্রাম্পের লাতিন আমেরিকান মিত্ররাও চাপ বাড়াচ্ছে কিউবার ওপর। ইকুয়েডর গত মাসে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে কুইটোতে কিউবার কূটনৈতিক মিশন বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছিল। ইকুয়েডর সরকার ও মার্কিন সামরিক বাহিনী ‘মাদক-সন্ত্রাসবাদ’ মোকাবিলায় ঘোষণা করেছিল যৌথ অভিযানেরও।
এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘কিউবায় যা ঘটছে, তা অবিশ্বাস্য। আমরা আগে ইরানের বিষয়টি শেষ করতে চাই। তবে তারপর এটা শুধু সময়ের ব্যাপার।’
কী করবে কিউবা
ট্রাম্প এখনো কিউবায় হামলার কোনো আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেননি। তবে আগে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ‘তার জন্য সম্মানের হবে কিউবা দখল করা’ এবং সেখানে ‘যা ইচ্ছা তাই করবেন’ তিনি।
সূত্রের বরাত দিয়ে ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, এই সপ্তাহের শুরুতে পেন্টাগনকে সরাসরি হোয়াইট হাউজ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিতে।
ট্রাম্পকে রাউল রদ্রিগেজের চিঠি পাঠানোর চেষ্টা প্রমাণ করে, আলোচনায় আগ্রহী কিউবা। তবে ধারণা করা হচ্ছে, দায়িত্বে থাকা রুবিওর মাধ্যমে তারা এটি করতে চায় না।
‘ব্যাক চ্যানেল টু কিউবা: ওয়াশিংটন ও হাভানার গোপন আলোচনার ইতিহাস’ বইয়ের সহ-লেখক পিটার কর্নব্লুহর মতে, ‘মনে হচ্ছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ট্রাম্পের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছাতে চাইছে কিউবা।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘এই প্রচেষ্টা থেকে বোঝা যায় তারা আর রুবিওকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিশ্বাস করছে না। ক্রমবর্ধমান সংকট সমাধানে তারা চাইছে সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে যেতে।’
এই চিঠিকে দেখা হচ্ছে হাভানা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা শুরুর এক অপ্রত্যাশিত চেষ্টা হিসেবে। এতে চেষ্টা করা হয়েছে অর্থনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্পকে আকৃষ্ট করার। তবে এই চিঠিতে কিউবা সম্ভাব্য মার্কিন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও করা হয়েছিল সতর্ক।
অন্যদিকে, কিউবার চলমান মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যৌথ অবস্থান নিয়েছে মেক্সিকো, স্পেন ও ব্রাজিল। কিউবার সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে দেশ তিনটি।

