নতুন করে গরিব হবে অনেক মানুষ
- মূল্য বাড়িয়ে ভর্তুকি কিছুটা সমন্বয় করা হচ্ছে : অর্থমন্ত্রী
- দ্রব্যমূল্যসহ মূল্যস্ফীতি ঘটবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই : সাবেক অর্থসচিব

সংগৃহীত ছবি
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে আরেক দফা ঘটবে মূল্যস্ফীতির বিস্ফোরণ। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন আয়ের মানুষ। অর্থনীতিবিদদের শঙ্কা, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমে নতুন করে গরিব হবে অনেকে। যারা এখন বসবাস করছে দারিদ্র্যসীমার ওপরে, যা বর্তমানে ২১ শতাংশের বেশি। এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংক এক পূর্বাভাসে বলেছে, নতুন করে গরিব হতে পারে কমপক্ষে ১২ লাখ মানুষ।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিতে তৈরি করছে নতুন চাপের তরঙ্গ। মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেওয়াসহ এর প্রভাব তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদে আঘাত করতে যাচ্ছে অর্থনীতির প্রায় সব খাতে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি অর্থনীতিতে ‘শক থেরাপি’— যা মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে একদিকে সরকারের আর্থিক চাপ কমায়, অন্যদিকে একসঙ্গে নাড়িয়ে দেয় উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় এবং নিত্যপণ্যের দাম। এতে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে সাধারণ মানুষ।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা; কিন্তু সরকারের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় অধিক ভর্তুকি দেওয়ার আর সুযোগ নেই
যদিও তেলের মূল্য বাড়ানোর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, আবার না-ও পারে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রবিবার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের তিনি বললেন, মূল্যস্ফীতির বাস্কেটে জ্বালানি তেলের অংশ সামান্য। দাম না বাড়িয়ে সরকার তহবিল থেকে ভর্তুকি দিয়েছে এতদিন। এখন মূল্য বাড়িয়ে কিছুটা সমন্বয় করা হচ্ছে।
নতুন সরকারের কার্যক্রম শুরু হয় গড় মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ নিয়ে, যা চলতি অর্থবছরের জুনে ৭ শতাংশের কাছাকাছি কমিয়ে আনার পরিকল্পনা ছিল সরকারের; কিন্তু জ্বালানির মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত মূল্যস্ফীতি কমানোর নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে না। বরং উল্টো উসকে দেবে— এমন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থসচিব মাহবুব আহমেদের মতে, জ্বালানির বাড়তি দাম জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোসহ মূল্যস্ফীতি যে বাড়াবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি বললেন, ‘এই মুহূর্তে প্রয়োজন মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা; কিন্তু সরকারের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় অধিক ভর্তুকি দেওয়ার আর সুযোগ নেই।’ তার মতে, এটি এখন পরিপূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তেলের দাম কমানোর পরামর্শ দিলেন এই অর্থনীতিবিদ।
শনিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার। অর্থ বিভাগের হিসাবে এ মূল্য সমন্বয়ের ফলে সরকার প্রতি মাসে গড়ে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি সাশ্রয় করতে পারবে। যদিও এতে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আরেক দফা বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এমনিতেই ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের বাজারে দাম বেড়েছে ভোজ্যতেল, চিনি ও মসলার। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে সরবরাহ বিঘ্নতার কারণে দাম বেড়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণার পরপর ঢাকা, চট্টগ্রামসহ মহানগরীগুলোতে বাস ভাড়া ৬৪ শতাংশ এবং দূরপাল্লার বাসে ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে মালিক সমিতি। এটি কার্যকরে সরকারের সঙ্গে চলছে দরকষাকষি। বাড়তি ভাড়া কার্যকর হলে শেষ পর্যন্ত ব্যয়ের চাপ পড়বে ভোক্তার ওপর। পরিবহন ভাড়া বাড়লে বাড়বে পণ্য পরিবহনের ভাড়া, যা যোগ হবে পণ্যের মূল্যের সঙ্গে।



