তেলের দামে লাফ, খাবারের প্লেটে পড়বে টান
- সরাসরি বাড়াবে উৎপাদন খরচ

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের আঁচ এবার সরাসরি পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশের জনজীবনে। গাজা থেকে লেবানন—মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের উত্তাপে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহব্যবস্থা অস্থির। যে সংকটকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে দেশে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের সমন্বয় আনা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ দশা। কারণ অতীত নজির বলছে, যখনই জ্বালানির দাম বাড়ে, তার সরাসরি আঘাত লাগে ফসলের ক্ষেত থেকে শুরু করে সাধারণের বাজারের থলেও।
সর্বশেষ ঘোষণায় চার ধরনের তেলের নতুন দর লিটারপ্রতি বাড়ানো হয়েছে আগের চেয়ে সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষি, পরিবহন ও নিত্যপণ্যের বাজারে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বেড়ে যাবে সবকিছুর দাম; বাড়বে সব খাতের উৎপাদন ব্যয়। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে কৃষি, শিল্পসহ সব খাতে।
কিছুদিন আগেও দেশে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল প্রায় ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা। কিন্তু নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৫ এবং কেরোসিন প্রতি লিটার ১৩০ টাকা। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ডিজেলে প্রতি লিটারে বেড়েছে প্রায় ১৫ এবং কেরোসিনে ১৮ টাকা।
দেশের কৃষি, সেচব্যবস্থা এবং পণ্য পরিবহন- সবকিছুই মূলত ডিজেলনির্ভর। ফলে তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়াবে, যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে চাপ সৃষ্টি করবে সাধারণ মানুষের খাদ্য ব্যয়ের ওপর।
সরকারের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়, ডলার সংকট এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রথমত, দেশের অধিকাংশ সেচ পাম্প ডিজেলচালিত হওয়ায় তেলের দাম বাড়লে সরাসরি সেচ খরচ বৃদ্ধি পায়। লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বৃদ্ধি মানেই কৃষকের একরপ্রতি উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা এই বাড়তি ব্যয় বহনে হিমশিম খান। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তারা বাধ্য হন আবাদ কমিয়ে দিতে।
দ্বিতীয়ত, কৃষিকাজের অন্যান্য ধাপেও রয়েছে জ্বালানির ব্যবহার। ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, ধান মাড়াইয়ের মেশিনসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র চালাতে প্রয়োজন হয় তেলের। সেই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে এসব যন্ত্র ব্যবহারের খরচ বাড়বে, যা উৎপাদন ব্যয়ের সামগ্রিক পরিমাণকে বাড়াবে উল্লেখযোগ্যভাবে।
তৃতীয়ত, কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও তেলের দাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে পণ্য আনার পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে তা শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দামে প্রতিফলিত হয়। ফলে ভোক্তাদের বেশি দামে খাদ্যপণ্য কিনতে হয়, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
চতুর্থত, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের লাভের পরিমাণ কমে যায়। অনেক সময় বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েন। এতে কৃষি পেশার প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে ফেলতে পারে হুমকির মুখে।
এই পরিস্থিতিতে করণীয় হিসেবে সরকারকে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষকদের জন্য জ্বালানিতে ভর্তুকি, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোও প্রয়োজন।
সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ যারা এরই মধ্যে মুদ্রাস্ফীতির চাপে পিষ্ট, তাদের জন্য এই বাড়তি ব্যয় বহন হয়ে পড়বে দুঃসাধ্য। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার ওপর পড়ে। তাই এ খাতকে সুরক্ষিত রাখতে পরিকল্পিত ও বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণ সময়ের দাবি।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে শুধু কৃষি পণ্য নয়, সব খাতে ব্যয় বাড়বে বলে মত দিলেন সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক।
আগামীর সময়কে বললেন, ‘জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সরাসরি কৃষি খাতসহ সামগ্রিক বাজারে প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে শুধু কৃষিপণ্য নয়, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সব ধরনের পণ্যের দামই বাড়বে।’
চলতি মৌসুমে সেচ কার্যক্রম প্রায় শেষ হওয়ায় তাৎক্ষণিক প্রভাব কিছুটা সীমিত থাকলেও সামনে ফসল সংগ্রহ, মাড়াই, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে খরচ বেড়ে যাবে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও স্বল্প সময়ে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া তাদের পক্ষে কঠিন হবে-যোগ করেন সাবেক এই আমলা।
এ অবস্থায় সরকার যদি কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে কৃষক কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। অন্যথায়, কৃষক মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বেন। একই সঙ্গে বাড়তি দামে পণ্য কিনতে হবে ভোক্তাদেরও। এমন শঙ্কার চিত্র তুলে ধরলেন আনোয়ার ফারুক।
‘বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে যুদ্ধজনিত কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হলে এর প্রভাব এড়ানো সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষক ও নিম্ন আয়ের মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কৃষকের বর্তমান বাস্তবতার দিকেও ইঙ্গিত করলেন তিনি। ‘অনেক কৃষক ইতোমধ্যে আলু ও পেঁয়াজের ন্যায্য দাম পাননি, প্রাকৃতিক কারণে ফসলের ক্ষতিও হয়েছে। তাই ধান বিক্রির ক্ষেত্রে যদি তারা ভালো দাম না পান, তাহলে তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।’

