তেলের দাম বাড়তেই ২০০ টাকার ভাড়া ৪০০
- দৈনিক তেল সরবরাহ বেড়ে ১৩ হাজার টন
- ১০ শতাংশেরও বেশি দামে বিক্রি শুরু
- ৪ লাখ টনের চাহিদায় মজুদ দেড় লাখ টন

হাতে ছাতা নিয়ে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোডে দাঁড়িয়ে আছেন ফায়জা কবির। গন্তব্য ফার্মগেট। সময় গড়িয়েছে প্রায় ৩০ মিনিট, তবুও দেখা নেই কাঙ্ক্ষিত বাসের। জমেছে যাত্রীদের ভিড়, কিন্তু গণপরিবহন যেন অমাবস্যার চাঁদ।
আক্ষেপের সুর ফায়জার মুখে। ‘আগে এই জায়গায় দাঁড়ানোই যেত না। বাসের কন্ডাক্টররা টানাটানি করত। বিরক্ত হয়ে গালাগালও দিতাম মাঝে মাঝে। কিন্তু এখন সেই বিরক্তি আর নেই— শুধু হতাশা। এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলেও বাস পাওয়া যায় না, আর এলেও উঠতে হয় ঠেলাঠেলি করে।’
রাজধানীর হাজারো যাত্রী এখন একই বাস্তবতার মুখোমুখি। উত্তপ্ত রোদ, ধুলোমাখা বাতাসের মধ্যে দীর্ঘ হচ্ছে তাদের অপেক্ষা। চোখেমুখে হতাশার ছাপ। রাজধানীর বাসস্টপগুলোর চিত্র এখন এমনই।
জ্বালানি তেলের সংকট ও সরবরাহে বিশৃঙ্খলার কারণে তীব্র হয়েছে গণপরিবহন সংকট। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে অফিসগামী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের যাপিত জীবনে।
আজ রবিবার সরেজমিনে কুড়িল বিশ্বরোড, বনানী, বাড্ডা ও ফার্মগেটে দেখা যায় অপেক্ষমাণ হাজারো যাত্রীকে। প্রতিটি বাসস্টপেই যাত্রীদের দীর্ঘ সারি। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, আবার কেউ ক্লান্ত হয়ে রাস্তায় হাঁটছেন বিকল্প পরিবহনের আশায়। বাস এলেই শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ, কিন্তু যাত্রীর চাপে উঠতে পারেন না অনেকেই।
কুড়িল এলাকায় বসবাসকারী তাইজুল ইসলাম কাজ করেন কারওয়ান বাজারের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। প্রতিদিনের যাতায়াত এখন তার জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। চোখেমুখে চাকরি ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা নিয়ে জানালেন, আগে বাস পেতে খুব সমস্যা হতো না। কিন্তু এখন সময়মতো অফিসে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। গত বুধবার অফিসে ঢোকার সময় ছিল সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টা, কিন্তু পৌঁছতে বেজে যায় সাড়ে ১০টা। এতে কর্মস্থলেও তৈরি হচ্ছে চাপ।
ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সুস্মিতা ও লতা আক্তার। কিন্তু বাসের জন্য অপেক্ষায়ই কেটেছে প্রায় এক ঘণ্টা। এর মধ্যে দুটি বাস এলেও যাত্রীতে ঠাসা থাকায় পারেননি উঠতে। শেষে অতিরিক্ত ভাড়ায় অন্য যানেই গন্তব্যে যাওয়ার জন্য নিয়েছেন সিদ্ধান্ত,- দুর্ভোগের বর্ণনা দিলেন তারা।
গণপরিবহন সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ জ্বালানি তেলের সংকট। অনেক সময় রাতভর লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানালেন বাসচালকরা। ‘আগের রাতে লাইনে দাঁড়াই আমরা। অনেক সময় রাত ২টার দিকে তেল পাই। তাও ভরা যায় না পুরো ট্যাংক। এরপর আবার দৌড়াতে হয় অন্য পাম্পে। যারা তেল নিতে পারে না, ঘোরে না তাদের গাড়ির চাকা। তাই কমেছে বাসের সংখ্যা’, এভাবেই জ্বালানি সংগ্রহের বর্ণনা দিলেন বিমানবন্দরগামী এয়ারপোর্ট পরিবহনের হেলপার গোলজার।
এদিকে দেশে বৈশ্বিক তেলের বাজারে দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাতের প্রভাব পড়ার কথা বলছেন সরকারের জ্বালানি খাতের দায়িত্বশীলরা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে চাপ বেড়েছে বলে তাদের দাবি।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানালেন, চলতি এপ্রিলে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন। মজুদ আছে ১ লাখ ২ হাজার টন, সঙ্গে চারটি জাহাজে আসছে আরও ১ লাখ টনের বেশি। জরুরি মজুত রয়েছে অতিরিক্ত ৮০ হাজার টন। ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত দৈনিক বিক্রি হয়েছে ১১ হাজার ১০৭ টন, যা গত বছরের তুলনায় কম। রবিবার থেকে সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়িয়ে উন্নীত হবে ১৩ হাজার ৪৮ টনে।
এদিকে গতকাল রাতে তেলের দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে নতুন দর নির্ধারণ করে দেশে জ্বালানি সরবরাহ ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। নতুন মূল্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০, পেট্রল ১৩৫ এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা।
অন্যদিকে সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিআরটিএ জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক পরিবহন মালিক সীমিত আকারে বাস চালাচ্ছেন, ফলে ব্যাহত হচ্ছে যাত্রীসেবা।
জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়তে না বাড়তেই চড়েছে ভাড়া। মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়া এখন আকাশচুম্বী। বাইকাররা ১০০ টাকার ভাড়া ২০০ থেকে ৪০০ টাকা নিচ্ছেন বলে উঠেছে অভিযোগ।
উত্তর বাড্ডা থেকে নিউ মার্কেট যাওয়ার জন্য বাসের অপেক্ষা করছিলেন রেজাউল করিম। গাড়ি না পেয়ে বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্ত নেন বাইকে যাওয়ার। দাম জিজ্ঞেস করতেই কপালে ওঠে চোখ। যেখানে তিনি ৩০০-৪০০ টাকার মধ্যে যেতেন সেখানে দাম চাচ্ছে ৮০০ টাকা।
এত দাম চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে হয়রানির ভয়ে নাম বলতে নারাজ চালক। জানালেন, তেল নিতে লাইনেই চলে যায় দিনের অর্ধেক। এরপর স্বাভাবিক মূল্যে গেলে পেটে যাবে না ভাত।

