ইসলামী ব্যাংক ঘিরে ফের উত্তেজনা
এস আলমকে ফেরাতে চান চাকরিচ্যুতরা, শাস্তি দাবি গ্রাহকদের
- পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ দুপক্ষের
- ১৫ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা
- বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন, বললেন এমডি
- একাধিক শাখায় বিঘ্ন গ্রাহকসেবা

নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে ইসলামী ব্যাংকে। দেশের বেসরকারি খাতের সর্ববৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা ও গ্রাহকরা পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করলে তৈরি হয় এ পরিস্থিতি। চাকরি ফিরে পাওয়া এবং বিশৃঙ্খলা রোধের পৃথক দাবিতে আজ রবিবার তারা অবস্থান নিয়েছিলেন রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে।
রবিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পুনর্বহালের পাশাপাশি এস আলমের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে ব্যানার নিয়ে হাজির হন কয়েকশ চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা। তারা অবস্থানের পাশাপাশি বিক্ষোভ করেন ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে। আর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গ্রাহক ও ভুক্তভোগী সমন্বয় পরিষদের ব্যানারে হয় পাল্টা কর্মসূচি। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে নেন গ্রাহকরা।
কর্মসূচিতে নানা স্লোগানের মাধ্যমে অবিলম্বে এস আলমকে দেশে এনে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান ভুক্তভোগী সমন্বয় পরিষদের নেতাকর্মীরা। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে উত্তেজনা, ব্যাংকের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। এমনকি টাকা তুলে নিতেও দেখা যায় কিছু শঙ্কিত গ্রাহককে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, দিলকুশায় মানববন্ধন করেন শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কয়েকশ কর্মকর্তা-কর্মচারী। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘অন্যায়ভাবে’ তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে তাদের দাবি।
ব্যাংকগুলোর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে এস আলমের হাতে মালিকানা ফিরিয়ে দিতে হুমকি দিয়ে চাকরিচ্যুতরা জানালেন— দাবি পূরণ না হলে ১৫ দিন পর দেওয়া হবে কঠোর কর্মসূচি।
বিনা কারণে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা আফরাদ হোসেনের। ‘অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আমাকে বিনা কারণে চাকরিচ্যুত করা হয়। আমার একটাই অপরাধ— বাড়ি পটিয়ায়। শুধু আমি নই, আমার সঙ্গে পটিয়াবাসী অনেকেই হন চাকরিচ্যুত। চাকরিতে পুনর্বহাল চাই আমরা। আমাদের একটাই দাবি, ফিরিয়ে দেওয়া হোক আমাদের চাকরি’— মানববন্ধনে স্লোগানের ফাঁকে এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন তিনি।
মানববন্ধনে ছিলেন চট্টগ্রামের পটিয়ার আল-আমিন। বললেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন চাকরি করেছি, হঠাৎ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমাদের বিনা কারণে করা হয় চাকরিচ্যুত। আমাদের চাকরির পাশাপাশি পুনর্বহাল করতে হবে এস আলমের মালিকানা। একই সঙ্গে বর্তমান পর্ষদ বাতিলসহ তিন দফা দাবি আছে আমাদের।’
অন্যদিকে ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদের ব্যানারে আন্দোলনকারীদের দাবি, ফের যেন এস আলমের হাতে না যায় ইসলামী ব্যাংকসহ ছয়টি ব্যাংক। গ্রেপ্তার এবং দেশীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে ব্যাংক লুটে অভিযুক্ত এস আলমসহ সব শীর্ষ লুটেরাকে। একই সঙ্গে ফেরাতে হবে বিদেশে পাচার করা অর্থ।
লুটেরাদের পুনর্বাসন ঠেকাতে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে সংযোজিত ১৮/ক ধারা বাতিল জরুরি বলে উল্লেখ করলেন আন্দোলনকারীরা। তাদের ভাষ্য, ব্যাংকের সামনে ‘মব’ সৃষ্টিকারী এস আলমের দোসর, ‘পটিয়া বাহিনীকে’ পুনরায় সুযোগ দিলে উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় নিতে হবে সরকারকে।
অবিলম্বে এস আলমপন্থিদের কাছ থেকে ইসলামী ব্যাংকগুলো প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে তারা বললেন, বিদেশ থেকে অর্থায়ন করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। ব্যাংক রক্ষায় গ্রাহক ও কর্মীদের থাকতে হবে ঐক্যবদ্ধ।
ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, দুপক্ষের কর্মসূচির কারণে গ্রাহকদের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক। গ্রাহকরা ব্যাংকে এলেও আতঙ্কে লেনদেন করতে পারেননি অনেকে।
উত্তেজনার কারণে ভেতরে ঢুকতে না পারার কথা জানালেন ইসলামী ব্যাংক মতিঝিল শাখার গ্রাহক মতিউর রহমান— ‘আসছিলাম ব্যাংকে কিছু টাকা তুলতে, কিন্তু পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে মতিঝিল এলাকার পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি।’
‘আমি একজন উদ্যোক্তা। ব্যবসায়িক কাজে টাকা ওঠাতে আসছিলাম, কিন্তু আন্দোলনের কারণে ভয়ে ছিলাম। আতঙ্কে সম্ভব হয়নি টাকা তোলা। এ ধরনের কর্মসূচি চলতে থাকলে লেনদেন করব না ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে। বেছে নিতে হবে বিকল্প প্রতিষ্ঠান’— হতাশা ব্যক্ত করলেন আরেক গ্রাহক আরেফিন শুভ।
একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকে সাবেক মালিকদের ফেরার সুযোগ রেখে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬ পাস হওয়ার পরই সামাজিক মাধ্যমে সরব হন চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা। ব্যাংকের অধিকাংশ শীর্ষ কর্মকর্তার এইআই নির্মিত ছবি ছড়িয়ে তাদের বিতর্কিত করার চেষ্টাও চলছে বলে উঠেছে অভিযোগ।
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, রাজধানীর ব্যাংকপাড়ায় চাকরিচ্যুতদের বিশাল আন্দোলন দেখানোর জন্য দুদিন ধরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজনকে আনা হয় ঢাকায়। তারা অবস্থান নেন বিভিন্ন হোটেলে। শনিবার রাতেও কয়েকশ মাইক্রোবাসে রাজধানীতে আসেন তারা।
নতুন অস্থিরতার বিষয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) আলতাফ হোসেন। তার ব্যাখ্যা, তারা (আন্দোলনকারীরা) ব্যাংকের দৃষ্টিতে যৌক্তিক কারণে চাকরিচ্যুত। সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইনে সরব হয়ে আগের ধারাবাহিকতায় মাঠে নেমেছেন তারা। চাকরি ফেরতের দাবি জানাতে পারলেও, কোনো গ্রুপকে মালিকানা ফেরতের দাবি বা হুমকি দিতে পারেন না তারা। এটি এখন আদালতের এখতিয়ার। বিচারিক প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত তাদের।
‘দীর্ঘদিনের এসব আন্দোলনে ব্যাংকের কোনো ক্ষতি হয়নি, বরং বেড়েছে আমানত। প্রতিষ্ঠানটি এখন ঘুরে দাঁড়ানোর পথে। গ্রাহকের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না এসব কর্মসূচি’— আশা আলতাফ হোসেনের।
ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস করতে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ গ্রাহক ফোরামের সভাপতি নুর নবী মানিকের। ‘একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংককে দুর্বল করার পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে ফের লুটপাটের সুযোগ। অতীতেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আনা হয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন। তৎকালীন চেয়ারম্যানকে বাধ্য করা হয় জোরপূর্বক পদত্যাগে। একই রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে করা হয় নতুন পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদন। আবার শুরু হয়েছে সেই প্রক্রিয়া’— বর্তমান সরকারের দিকে আঙুল তুললেন তিনি।
আন্দোলনকারীদেরও সমালোচনা করলেন নুর নবী। তার দাবি, ইসলামী ব্যাংকের সামনে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করেছে কিছু ব্যক্তি। প্রকৃত ব্যাংক কর্মচারীও ছিলেন না তাদের অনেকেই। অধিকাংশই আবার ভুয়া সনদে নিয়েছিলেন চাকরি। পরে তাদের চাকরি নিয়মিত করার চেষ্টা করা হলেও বাধা দেন নিজেরাই। যোগ্যতা প্রমাণ করতে রাজি নন তারা।
ভবিষ্যতে ইসলামী ব্যাংকের সামনে এ ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হলে গ্রাহকরা বসে থাকবেন না। তারা শান্তিপূর্ণভাবে পাল্টা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন, হুঁশিয়ারি দিলেন তিনি।
ব্যাংক খাতকে লুটেরাদের কবল থেকে মুক্ত না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেন নুর নবী। তিনি জানালেন, ১৫ দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজন করা হবে ব্যাংকটির সামনে অবস্থান, সারা দেশে জনমত গঠন, লিফলেট বিতরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, সমাবেশ ও সেমিনার।

