সংসদ যেন ‘ট্রেনিং গ্রাউন্ড’
- ভুলভাল সম্বোধন সদস্যদের
- একে অন্যকে ডাকছেন ‘ভাই’
- পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপনেও বিভ্রান্তি
- প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছে দলগুলো
- এমপিরা পড়ছেন সংবিধানের বই

ছবিঃ আগামীর সময়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের এক বিকেল। সেদিন সভাপতিত্ব করছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। এক সদস্যের (এমপি) বক্তব্য শেষে তাকে ধন্যবাদ দিতে গিয়ে ডেপুটি স্পিকার বলে বসলেন, ‘ধন্যবাদ মাননীয় স্পিকার’। নিজেই নিজেকে ধন্যবাদ দিয়ে হেসে ফেলেন তিনি, বুঝতে পারেন ভুলও। এ ঘটনা সে সময় সংসদে সৃষ্টি করে হাস্যরসের।
এবারের সংসদে এই ধরনের বোঝার ভুল হচ্ছে অহরহই। কেউ ভুল করছেন সম্বোধন করতে, কেউ ভুলে যাচ্ছেন যথাযথ সম্মান দিতে, আবার কোনো সদস্য অধিবেশনের মধ্যেই একজন আরেকজনকে ডেকে বসছেন ভাই। ফলে মাঝেমধ্যেই এসব নিয়ে সংসদে তৈরি হচ্ছে বিব্রতকর পরিস্থিতি। এই সংকটের অন্যতম কারণ, এবারের সংসদে যারা জনপ্রতিনিধি হয়ে গিয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশই নতুন।
এমনকি জাতীয় সংসদের ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মতো নতুন দুজনকে পাওয়া গেছে সরকার ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান— কারোরই নেই আগে সংসদ সদস্য হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা। তাদের মতোই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সদস্য। নতুন সদস্যের এই উপস্থিতি সংসদে বাড়াচ্ছে আচরণগত ও প্রক্রিয়াগত ভুলের ঘটনা।
সংসদ অধিবেশনের আছে কিছু রীতি, কিছু আছে প্রক্রিয়াও। নতুন সদস্যরা তার সঙ্গে অভ্যস্ত না হওয়ায় কখনো ‘মাননীয়’ সম্বোধনের পরিবর্তে ‘ভাই’ ব্যবহার, আবার কখনো ঘটাচ্ছেন পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপনে বিভ্রান্তির মতো ঘটনা। এমনকি ছোটখাটো ভুল করে বসছেন স্পিকারও। আবার কেউ একজন ভুল করলে, অন্যরা করে দিচ্ছেন তা সংশোধন। শুধরে দিচ্ছেন অভিজ্ঞরা, বাতলে দিচ্ছেন সমাধানও। যেহেতু এখন সংসদ অধিবেশন সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, তাই এসব দেখছেন দেশের মানুষও। অবস্থা দেখে অনেকের কাছেই এ সংসদকে মনে হচ্ছে ‘ট্রেনিং গ্রাউন্ড’, যেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নিতে আসছেন প্রশিক্ষণ, শিখছেন দাপ্তরিক ভাষা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ২৯৮ সদস্যের মধ্যে অন্তত ২০৯ জন (৭০ শতাংশ) প্রথমবারের মতো হয়েছেন নির্বাচিত। ২১০ আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করা বিএনপিতেই নতুন মুখ ১৩৩টি। অর্থাৎ দলটির সংসদীয় দলের ৬৩ শতাংশ সদস্যই প্রথমবারের মতো গিয়েছেন সংসদে।
বিএনপির তুলনায় প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নতুন মুখের হার আরও বেশি। দলটির ৬৮ সংসদ সদস্যের মধ্যে ৫৯ জনই (৮৬ শতাংশ) নতুন। ছোট যে দলগুলো রয়েছে, তাদের সব এমপিই নতুন। এর মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পথ পেরিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছয়জনই নির্বাচিত হয়েছেন প্রথমবারের মতো। একইভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, গণ অধিকার পরিষদ এবং গণসংহতি আন্দোলনের ছয় সংসদ সদস্যই নতুন। সাতজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের মধ্যে ছয়জনই নির্বাচিত হয়েছেন প্রথমবারের মতো।
অনভিজ্ঞতা বাড়াচ্ছে বিব্রতকর মুহূর্ত
নতুন সদস্যদের অনভিজ্ঞতার কারণে তৈরি হয়েছে বেশ কিছু বিব্রতকর পরিস্থিতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে সেসব পরিস্থিতির ভিডিও ঘুরছে সবার ফোনে কিংবা স্ক্রিনে।
এক অধিবেশনে কুমিল্লা-৪ আসনের এমপি হাসনাত আবদুল্লাহকে সম্পূরক প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ দেন ডেপুটি স্পিকার। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘সম্মানসূচক’ সম্বোধন না করে তিনি ‘সালাহউদ্দিন সাহেব’ বলে সম্বোধন করেন। স্পিকার বিষয়টি মনে করিয়ে দিলে তাৎক্ষণিকভাবে ভুল স্বীকার করেন তিনি।
তখন হাসনাত বলেছিলেন, ‘সালাহউদ্দিন সাহেবকে প্রশ্ন করলে কখন নোটিশ দেওয়ার কথা বলে ফেলেন; সেই বিষয়টি নিয়ে আমরা সংকুচিত থাকি। আমরা পুলিশ সংস্কার নিয়ে কথা বলছি; পুলিশের সুশৃঙ্খলতা নিয়ে কথা বলছি।’
হাসনাতের বক্তব্য দেওয়ার সময় পাশ থেকে কথা বলতে থাকেন অন্য এমপিরা। ‘সালাহউদ্দিন সাহেব’ নয় ‘মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’ বলে ডাকার কথা মনে করিয়ে দেন তারা। পরে হাসনাত নিজের ভুল সংশোধন করেন। এটাও নিশ্চিত করেন, প্রথাগত যে ভুলগুলো তারা করছেন, সেগুলো ধরিয়ে দিলেই করে নেবেন সংশোধন।
একইভাবে রংপুর-৪ আসনের এমপি আখতার হোসেন অন্য সদস্যদের ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করলে তাকে সতর্ক করেন স্পিকার। আখতারকে স্পিকার বলেছিলেন, ‘এই সংসদে আপনার অনেক মামা, চাচা, খালু থাকতে পারেন, কিন্তু সবাইকে মাননীয় সদস্য বলে সম্বোধন করবেন, ভাই বলবেন না।’
মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলে বসেন, ‘ভাই আমাকে এক মিনিট সময় দেওয়া যাবে স্পিকার মহোদয়?’ হেসে বিষয়টি সংশোধন করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জবাব দিয়েছিলেন, ‘ভাই যেহেতু বলেছেন, এক মিনিট সময় দিতেই হয়।’
এ তো গেল কথার শিষ্টাচারের প্রসঙ্গ। তবে এবারের সংসদে বিল উত্থাপন করতে গিয়েও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন কেউ কেউ। যার মধ্যে রয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। বিলের নির্ধারিত অংশ পড়তে গিয়ে তিনি বারবার পড়ছিলেন জটিলতায় এবং হিমশিম খাচ্ছিলেন বাক্যের সামঞ্জস্য মেলাতে। তবে তরুণ এই প্রতিমন্ত্রীর এসব ভুল সংশোধনের সুযোগ করে দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। যদিও অল্প সময়ের মধ্যেই রীতিমতো ভাইরাল হয়ে যায় এই বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ।
কেন নুরুল হক নুর এত হোঁচট খাচ্ছিলেন, সে সম্পর্কে তিনি কিছু না বললেও তার পক্ষে এগিয়ে আসেন সাবেক রাজনৈতিক সহযোদ্ধা রাশেদ খান। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় দেওয়া এক পোস্টে তিনি প্রতিমন্ত্রীর এই হোঁচট খাওয়াকে অভিহিত করেন ‘দাপ্তরিক ভুল’ হিসেবে।
তার দাবি, ভুল নুরের নয়; বরং তিনি যে বিলটি পড়ছিলেন সেটির। বাক্যগুলো এমনভাবে সাজানো ছিল যে, চাইলেও সামঞ্জস্য বজায় রেখে পড়তে পারছিলেন না নুর। রাশেদ মনে করেন, নুর নিজেও বুঝতে পারছিলেন যে শব্দ ও বাক্যের গঠন ঠিক নেই, যা তাকে করে তুলছিল আরও বেশি বিচলিত।
প্রশিক্ষণে জোর
সংসদ অধিবেশনের যখন এমন বাস্তবতা, তখন রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের উদ্যোগে নবনির্বাচিত এমপিদের করছে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। জামায়াতে ইসলামী দুদিনব্যাপী ‘ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম’ আয়োজন করে সংসদীয় কার্যপ্রণালি, বিল প্রণয়ন, বাজেট বিশ্লেষণ ও বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে দিয়েছে প্রশিক্ষণ।
অন্যদিকে বিএনপিও করেছিল গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে নবনির্বাচিত এমপিদের জন্য কর্মশালার আয়োজন। যেখানে সংসদীয় বিধি, আচরণ, বিল প্রক্রিয়া ও পয়েন্ট অব অর্ডারসহ দেওয়া হয় বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা। পাঁচটি আলাদা সেশনে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে তাদের দেওয়া হয় সংসদীয় প্রোটোকল, ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত ভূমিকা এবং বিল পাসের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা।
এমনকি ভবিষ্যতে দ্বিকক্ষের সংসদ গঠন হলে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হতে পারে, সে বিষয়েও ধারণা দেওয়া হয়েছে অংশগ্রহণকারীদের। কতদিন এভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, তা জানতে কথা হয় জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সঙ্গে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবছরই এ ধরনের কর্মশালার পরিকল্পনা আছে জামায়াতের। যার মাধ্যমে বাড়ানো হবে সংসদ সদস্যদের দক্ষতা ও যোগ্যতা।
শিখছেন নতুনরা, পড়ছেন সংবিধান
নতুন দায়িত্ব পাওয়া অনেক সংসদ সদস্যকেই ফিরতে হয়েছে পড়ার টেবিলে। কেউ কেউ নতুন করে কিনেছেন সংবিধান, সংসদীয় কার্যপ্রণালি-বিধি পড়ে চেষ্টা করছেন বোঝার। প্রথমবার এমপি হয়েছেন— এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তারা অকপটেই স্বীকার করলেন প্রথমবার সংসদে গিয়ে কিছুটা সমস্যায় পড়ার কথা। তবে সংবিধান পড়ে, আচরণবিধি পড়ে ধীরে ধীরে শিখে নিচ্ছেন বলেও জানালেন।
তাদের মধ্যে একজন বললেন, ‘নতুন দায়িত্ব আমাকে লেখাপড়ায় ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। বুঝতে পারছি, সংসদে কথা বলতে হলে, দাপ্তরিক কাজ করতে হলে আমাকে অনেক কিছু জানতে হবে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের মতে, সংসদে নতুন সদস্যের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবং যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের অভাবেই বাড়ছে কার্যপ্রণালিগত ভুলের পরিমাণ। এটিকে মোটেও অস্বাভাবিক মনে করেননি তিনি। তবে তার মতে, এসব ভুল শোধরাতে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। দায়িত্ব রয়েছে সংসদ সচিবালয়েরও। তারা নিয়মিত করতে পারে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন।
সংসদ অধিবেশন সরাসরি সম্প্রচার হওয়ায় প্রতিটি আচরণ ও বক্তব্য জনগণের সামনে দৃশ্যমান হয়, এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন মাহবুবুর রহমান। তিনি মনে করেন, এ কারণে সংসদ সদস্যদের আরও সতর্ক ও প্রোটোকলসচেতন হওয়া জরুরি। ‘তা না হলে আইনপ্রণেতাদের কার্যক্রম নিয়েই জনমনে প্রশ্ন উঠবে, তারা হয়ে উঠবেন হাস্যরসের পাত্র, যা ভালো কোনো উদাহরণ তৈরি করবে না।’

