জ্বালানি সংকটে ভরসা নবায়নযোগ্য শক্তি
- ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকিতে
- নবায়নযোগ্য শক্তির যন্ত্র আমদানিতে চড়া শুল্ক
- আমদানিতে শুল্ক, ভ্যাট, অন্যান্য কর প্রত্যাহার দাবি

ছবিঃ আগামীর সময়
ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা পড়েছে হুমকিতে। জ্বালানি সংকটের প্রভাবে দেখা দেওয়া অর্থনৈতিক ঝুঁকি কাটিয়ে উঠতে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি থেকে সরে এসে দ্রুত নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারের তাগাদা এসেছে।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) বলছে, জ্বালানি সংকটের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একমাত্র ভরসা হতে পারে নবায়নযোগ্য শক্তি। আজ সোমবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি জানায়, এলএনজি, তেল ও কয়লার আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে সরকারকে প্রতিদিন দিতে হচ্ছে ২০০ কোটি টাকারও বেশি ভর্তুকি, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে আয়োজন করা হয়েছিল এই সংবাদ সম্মেলনের। সেখানে বলা হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় জ্বালানি সরবরাহ ভেঙে পড়ার অবস্থা হওয়ায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে। বিশেষ করে গ্যাসের তীব্র সংকটে তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫-১২০ ডলারে পৌঁছানো এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে।
দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৪ হাজার এমএমসিএফডি। তবে এ চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ৮৫০-৯০০ এমএমসিএফডিতে নেমে আসায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিদিন ঘাটতি দেখা দিচ্ছে প্রায় ১ হজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের, যা দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিয়েছে ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত।
এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে বিএসআরইএ উল্লেখ করেছে, দেশে বর্তমানে কৌশলগত জ্বালানির মজুদ (স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ) অত্যন্ত নগণ্য, যা মাত্র ৩৫-৪০ দিনের জন্য যথেষ্ট এবং এটি আরও ভঙ্গুর করে তুলছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে।
এই সংকট নিরসনে বিএসআরইএ পেশ করেছে একটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর আরোপিত বর্তমান ৫০-৬০ শতাংশ শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে অবিলম্বে।
সংস্থাটি প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের উদাহরণ টেনে জানায়, সঠিক নীতি সহায়তা ও শুল্কমুক্ত সুবিধার মাধ্যমে তারা সৌর বিদ্যুতে ঘটিয়েছে বিপ্লব। অথচ বাংলাদেশে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি আমদানিতে উচ্চ শুল্ক বাধাগ্রস্ত করছে এই খাতের বিকাশকে।
বিএসআরইএ আরও মনে করে, বিগত সরকারের আমলে বাতিল হওয়া ৩ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি সক্ষমতার ৩১টি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প ফের চালু করা সম্ভব হলে সরকার বছরে সাশ্রয় করতে পারত প্রায় ১০ হাজার ৮০০ কোটি টাকার আমদানি ব্যয়।
তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এ প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সহজ সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিশ্চিত করা এবং এই খাতের কোম্পানিগুলোকে অন্তত ২০ বছরের জন্য ট্যাক্স হলিডে বা কর অবকাশ সুবিধা প্রদানের ওপর।
সংস্থাটির মতে, বর্তমান এই চ্যালেঞ্জকে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে যথাযথ নীতি সহায়তা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যা নিশ্চিত করবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা।
বিএসআরইএর সহসভাপতি রুহুল আমিনের ভাষ্য, বিগত সরকারের নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে ছিল না কোনো আন্তরিকতাই। বিষয়টিকে যাতে আরও উন্নত করা যায়, নেওয়া হয়নি সেরকম কোনো পদক্ষেপই।
এমন পরিস্থিতিতে সংকট উত্তরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতির ওপর থেকে সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহার, স্থগিত হওয়া সৌর প্রকল্পগুলো ফের চালুর জন্য সরকারের প্রতি জরুরি আহ্বান জানিয়েছে বিএসআরইএ।















