হোয়াইট হাউসের গল্প
অন্যজনের প্রচারে নেমে নিজেই প্রেসিডেন্ট

আগামীর সময় গ্রাফিক্স
জেমস আব্রাম গারফিল্ড। যুক্তরাষ্ট্রের ২০তম প্রেসিডেন্ট। ভাঙা পরিবারের সন্তান। দারিদ্র্যের উজান স্রোত ঠেলে কুঁড়েঘর থেকে উঠে এসেছিলেন হোয়াইট হাউসের রাজকীয় মহলে। কথার জাদুতে বশ করেছিলেন পুরো যুক্তরাষ্ট্রকে। দেখতেও ছিলেন অদ্বিতীয়। প্রথম দর্শনেই তাক লাগিয়ে দিতেন। নীল চোখ, পেটানো শরীরের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, গালভর্তি গোঁফ-দাড়িতে ঢাকা কণ্ঠের গমগমে আওয়াজে ঝলসে উঠত নেতৃত্বের চমক। নিজগুণে হয়ে উঠেছিলেন দেশটির ইতিহাসের প্রথম ভাগ্যবান রাজনীতিক!
পরিবেশ-সময়-সুযোগ-যোগ্যতা- সব একসঙ্গে হাতের মুঠোয় থাকতেও প্রেসিডেন্ট হতে চাননি কখনো। অবলীলায় নেমেছিলেন বন্ধুর প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতার প্রচারে। ভাগ্যের কী রসিক খেয়াল, দিন শেষে তিনিই হয়ে গেলেন প্রেসিডেন্ট। আরেকটি পালক জুড়ে দিলেন হোয়াইট হাউসের বর্ণিল ইতিহাসে। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল সেই কালজয়ী গল্প- প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর প্রচারে নেমে নিজেই প্রেসিডেন্ট!
প্রেসিডেন্টের হত্যাকারী গুইটোও চড়া গলায় বলেছিলেন সেই কথা- ‘আমি শুধু গুলি করেছি, তাকে মেরেছে ডাক্তাররাই।’
১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর। ওহাইওর প্রত্যন্ত অঞ্চল অরেঞ্জ টাউনশিপের (দেলাওয়ার কাউন্টি) মোরল্যান্ড গ্রামে মা এলিজা ব্যালুর কুঁড়েঘর আলো করে জন্ম নেন যুক্তরাষ্ট্রের এই সূর্যসন্তান। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। বাবা আব্রাম গারফিল্ড ছিলেন দরিদ্র কৃষক। যুক্তরাষ্ট্রের ডাকসাইটে প্রেসিডেন্টের মতো পরিবারের ছোট সন্তান হিসেবে শৈশবের সে আদরও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি জেমস গারফিল্ডের কপালে। অভাব-অনটনের সংসারে মাত্র ১৮ মাস বয়সেই বাবাকে হারান। রোজগারের একমাত্র কাণ্ডারিকে হারিয়ে পুরো পরিবার তখন পথে বসার দশা। অকূলপাথারে পড়েন পাঁচ সন্তানের জননী এলিজা। কিন্তু হাল ছাড়েননি। নিজের সেলাই দক্ষতা সম্বল করে নেমে পড়েন দর্জির কাজে। ছিল স্বামীর রেখে যাওয়া কিছু জমি। দুধের শিশুকে বুকে নিয়েই নেমে পড়েন ‘পুরুষের পৃথিবীতে’। বড় হতে থাকে গারফিল্ডও।
ডানপিটে ছেলেটি বড় হলে কিছু একটা হবে- কৈশোরেই সেই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল গারফিল্ডের গ্রামে। ২০-৩০ ফুটের কুঁড়েঘরের কাঠের দেয়াল তাকে বেশি ধরে রাখতে পারবে না- সে নমুনাও মিলছিল পায়ে পায়ে। যেমন পরিশ্রমী, তেমনি মেধাবী। পড়াশোনার খরচ চালাতে কৃষিকাজ, খাল কাটা, ধর্ম প্রচার, কী করেননি জীবনে!
ভিড় থেকে ভেসে আসে এক অনাকাক্সিক্ষত কণ্ঠ- ‘আমরা চাই গারফিল্ডকে!’ ব্যস! কেল্লা ফতে। উপস্থিত সবাই লুফে নেন সেই কণ্ঠ- ‘গারফিল্ডকে চাই’। শুনে ‘থ’ হয়ে যান গারফিল্ড নিজেই। কিংকর্তব্যবিমূঢ়!
শিক্ষাজীবন শেষে আইন ব্যবসায় নেমে ঝড় তোলেন আদালতপাড়ায়ও। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী গারফিল্ড। বলিউডের ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের জীবন নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর দুহাতে লেখা শিক্ষক (ভাইরাস, বীরুপ্রসাদ শাস্ত্রী) চরিত্রের ধারণাটিও বোধকরি গারফিল্ডের জীবন থেকেই নিয়েছিলেন পরিচালক রাজকুমার হিরানি। কল্পকাহিনি নয়, বাস্তবিকই দুহাতে লিখতে পারতেন গারফিল্ড। একসঙ্গে, একই সময়ে এক হাতে লিখতেন গ্রিক ভাষায় অন্য হাতে লাতিন। ওহাইওর স্কুলজীবন শেষে ভর্তি হন ম্যাসাচুসেটসের উইলিয়ামস কলেজে। সেখান থেকেই স্নাতক, পরে আইন। ছাত্রজীবনেই ওহাইওর হিরামের (চার্চে যুক্ত) শিক্ষক হন। ২৬ বছর বয়সে সেই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। কিশোর বয়সেই ওহাইওর এরি খালের কাজে নামেন। হিরামে পড়াশোনার খরচ চালাতে সেখানকার পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজেও কুণ্ঠিত হননি। ২৮ বছর বয়সে (১৮৫৯) নির্বাচিত হন ওহাইও জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে রাজ্য সিনেটর হিসেবে। শুরু হলো নতুন জীবন। ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্টের বীজ বপন করেন এখানেই। প্রিয়মুখ হয়ে ওঠেন ওহাইওর। ১৮৬১ সালে (গৃহযুদ্ধের সময়) রাজনীতি ছেড়ে যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। কেন্টাকির ১৭তম ব্রিগেডের দাপুটে মেজর জেনারেল হিসেবে কাটান দুই বছর। পুরো পদাতিক বাহিনীকে বীরত্বের সঙ্গে নেতৃত্ব দেন টেনেসি, জর্জিয়া, কেন্টাকির বেশ কয়েকটি যুদ্ধে। আবার ফিরে আসেন রাজনীতিতে। ১৮৬২ সাল থেকে শুরু করে পরপর নয়বার নির্বাচিত হন কংগ্রেসে। এরপরই এলো সেই দিন!
১৮৮০ সাল। রিপাবলিকান পার্টির তখন ভঙ্গুর দশা। তিন বছরের মাথায় অসন্তোষ নেমে আসে রিপাবলিকান সমর্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ১৯তম প্রেসিডেন্ট রাদারফোর্ড বি হেইসে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের ক্রমবর্ধমান আস্থাহীনতায় তৈরি হয় বিশাল নেতৃত্বশূন্যতা। একত্রীকরণের মন্ত্র নিয়ে মাঠে নামেন ‘বাকপটু’ গারফিল্ড। শুরু হয় নতুন প্রার্থী বাছাই পর্ব। শিকাগোতে দলের জাতীয় সম্মেলন ডাকে রিপাবলিকান। সেখানেও প্রকট হয়ে ওঠে দলের অন্তর্কোন্দল। দৃশ্যমান হয়ে ওঠে গভীর বিভক্তি। একপক্ষ চাইছিলেন ১৮তম প্রেসিডেন্টে ইউলিসিস এস গ্রান্টকেই তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় বসাতে। অন্যরা আবার দ্বিমত। বাকিরা চাইছিলেন দলের অভিজ্ঞ নেতা জেমস জি ব্লেইনকে। গারফিল্ড সমর্থন দেন তার বন্ধু ও সহরাজনীতিক জন শেরম্যানকে। কিন্তু বিধিবাম! ১৫ হাজার কর্মীর সম্মেলনে টানা ৩৫ বারের ভোটাভুটিতেও সুরাহা হয় না কে হবেন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। শেরম্যানের পক্ষে একের পর এক বক্তৃতায় মুখে ফেনা তুলে ফেলেন স্বয়ং গারফিল্ডও। কিন্তু ফল হয় উল্টো। বাগ্মী দক্ষতায় বন্ধুর বদলে উল্টো তিনিই হয়ে ওঠেন জনপ্রিয়। তলে তলে দিন ঘুরতে থাকে তারই। গুণগ্রাহী বাড়তে থাকে। প্রার্থী বাছাইয়ের ৩৬তম সভায় হাতেনাতে সেই ফল পান গারফিল্ড। শেরম্যানকে মনোনয়নের জন্য তার উৎসাহী ভাষণ মুগ্ধ করেছিল নেতাকর্মীদের। ৩৬তম সভার ঠিক আগের এক ভাষণের মাঝপথে গারফিল্ড চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘উপস্থিত মহোদয়গণ, এখন তাহলে কী চাই আমরা? অমনি ভিড় থেকে ভেসে আসে এক অনাকাক্সিক্ষত কণ্ঠ- ‘আমরা চাই গারফিল্ডকে!’ ব্যস! কেল্লা ফতে। উপস্থিত সবাই লুফে নেন সেই কণ্ঠ- ‘গারফিল্ডকে চাই’। শুনে ‘থ’ হয়ে যান গারফিল্ড নিজেই। কিংকর্তব্যবিমূঢ়! প্রেসিডেন্ট হওয়ার বিতৃষ্ণা থেকেই বন্ধুর পক্ষে প্রচারে নেমেছিলেন। দিন শেষে তার ঘাড়েই পড়ল সেই ভার! অবশেষে ৩৬তম বৈঠকে নির্ধারিত হয় প্রার্থী। প্রতিনিধিদের ভোটে মনোনয়ন পান গারফিল্ড। চেস্টার আর্থারকে (২১তম প্রেসিডেন্ট) নির্বাচিত করা হয় তার রানিং মেট হিসেবে। সেই বছরের নভেম্বরে গারফিল্ড ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী উইনফিল্ড স্কট হ্যানকককে হারিয়ে নির্বাচিত হন যুক্তরাষ্ট্রের ২০তম প্রেসিডেন্ট। ১৮৮১ সালের ৪ মার্চ শপথ নেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়টি হলো, চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে গুরুতর আহত হন আততায়ীর গুলিতে। টানা ৭৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়েন হোয়াইট হাউসের সুরক্ষিত কক্ষে। সে আরেক ইতিহাস!
১৯ সেপ্টেম্বর ৪৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের কিংবদন্তি নেতা জেমস গারফিল্ড। দীর্ঘ ভোগান্তিতে ওজন ২২৫ থেকে ১৩০ পাউন্ডে নেমে গিয়েছিল। ময়নাতদন্তে দেখা যায়, পুঁজে ভরেছিল পুরো শরীর। গুলি ছিল অগ্ন্যাশয়ের কাছে।
‘থ্রি ইডিয়টস’-এর দুহাতে লেখা শিক্ষক (ভাইরাস, বীরুপ্রসাদ শাস্ত্রী) চরিত্রের ধারণাটিও বোধকরি গারফিল্ডের জীবন থেকেই নিয়েছিলেন পরিচালক রাজকুমার হিরানি। কল্পকাহিনি নয়, বাস্তবিকই দুহাতে লিখতে পারতেন গারফিল্ড। একসঙ্গে, একই সময়ে এক হাতে লিখতেন গ্রিক ভাষায় অন্য হাতে লাতিন।
কীভাবে হত্যা : ১৮৮১ সালের ২ জুলাই। ওয়াশিংটন ডিসির বাল্টিমোর এবং পোটোম্যাক রেলরোড স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় গারফিল্ড। গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা নিয়ে বেরিয়েছিলেন। ওহাইর এক সম্মেলন, উইলিয়াম কলেজের সহপাঠীদের সঙ্গে ২৫তম পুনর্মিলনী; একই সঙ্গে নিউ জার্সিতে তার প্রিয়তমা স্ত্রী লুক্রেশিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ। কলেজ জীবনের প্রেমিকা (চেস্টারের গিওগা সেমানিরি কলেজ)। স্বামীকে কাছে পেতে অধীর অপেক্ষায় ছিলেন ম্যালেরিয়া থেকে সদ্য সেরে ওঠা লুক্রেশিয়াও। শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে গেল সেই আশা! বাধা হয়ে দাঁড়ালেন আততায়ী চার্লস গুইটো। গারফিল্ডকে বাগে পেতে ওত পেতে থাকা অসন্তুষ্ট-ভবঘুরে এ ফেডারেল কর্মচারী ভিড় ঠেলে আচমকা পেছনে এসে দাঁড়ান গারফিল্ডের। পকেটের (পয়েন্ট ৪৪ ক্যালিবার রিভলবার) পিস্তলটি বের করেন। পিঠে আর কোমরে (মেরুদ-ের ৪ ইঞ্চি পাশে) চেপে ধরে পরপর দুটি গুলি। মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়েন প্রেসিডেন্ট। রক্তে ভেসে যায় প্ল্যাটফর্ম। গুইটো অবশ্য পালাতে পারেননি। আর্তচিৎকারে জড়ো হওয়া জনতার ফাঁক দিয়ে পালানোর পথেই ধরা পড়েন পেছন থেকে ছুটে আসা পুলিশের হাতে।
গুলিতে নয়, মৃত্যু চিকিৎসকের দম্ভে : জেমস গারফিল্ডের মৃত্যু নিয়েও রয়েছে ঢের বিতর্ক। বেশিরভাগ গবেষকেরই বক্তব্য, দাম্ভিক চিকিৎসক উইলার্ড ব্লিসের কারণেই মৃত্যু হয় তার। গুলিটি ঠিক কোথায় গেঁথে আছে- খুঁজে পেতে নতুন এক যন্ত্র তৈরি করেন টেলিফোন আবিষ্কার করে সাড়া ফেলে দেওয়া সে সময়ের বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল। কিন্তু অহমিকার কারণে সেটিকে গুরুত্ব দেননি চিকিৎসক দলের প্রধান দেশের নামকরা সার্জন ব্লিস। চিকিৎসাবিদ্যায় নিজের বাহাদুরি দেখাতে জোর দিয়ে বলেছিলেন, গুলি রয়েছে কোমরের ডান পাশে। যেখানে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। পুঁজ বের হচ্ছে। পরে অবশ্য সুরতহালে গ্রাহাম বেলের আবিষ্কৃত টেলিফোনসদৃশ সেই যন্ত্রটির তথ্যই সঠিক হয়। গুলিটি ছিল কোমরের বাম পাশে। অগ্ন্যাশয়ের কাছে। গারফিল্ড নিয়ে নির্মিত চার পর্বের ‘ডেথ বাই লাইটেনিং’ সিরিজে বলা হয়েছে- অতি আত্মবিশ্বাস দূরে ঠেলে যন্ত্রনির্দেশিত কোমরের বাঁদিকটায় অস্ত্রোপচার করলেই বেঁচে যেতেন গারফিল্ড! ২০২৪ সালে ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের সিনিয়র ইতিহাসবিদ জেফ্রি এস. রেজনিকের কলমেও উঠে আসে চিকিৎসক ব্লিসের সেই অহমিকা। ব্লিস সম্পর্কে জানিয়েছিলেন, তিনি কোনো দ্বিতীয় মতামত নিতে দেননি এবং ভুল প্রমাণিত হতে চাননি। প্রেসিডেন্টের হত্যাকারী গুইটোও চড়া গলায় বলেছিলেন সেই কথা- ‘আমি শুধু গুলি করেছি, তাকে মেরেছে ডাক্তাররাই।’














