তদবিরে চূড়ান্ত ডিসি ফিটলিস্ট!
- ২৮তম ব্যাচের প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তার ভাইভা নেওয়া হয়েছে ৭ এপ্রিল
- ২৯তম ব্যাচের কর্মকর্তারা হাজির হয়েছেন পরের দিন
- ‘সংশ্লিষ্ট কমিটি ভালো বলতে পারবে’

আগামীর গ্রাফিক্স
ডিসি ফিটলিস্ট। নামেই বোঝা যায় ডিসি (জেলা প্রশাসক) হওয়ার যোগ্যদের তালিকা, যা তৈরি হয় ধাপে ধাপে। সেই প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে এই লিস্ট চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
অথচ ব্যাচভিত্তিক তালিকা করে মৌখিক পরীক্ষার দিনক্ষণ প্রকাশ করাই জনপ্রশাসনের রীতি; তাও খোদ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে। রীতিমতো বিসিএস পরীক্ষার মতো প্রস্তুতি নিয়ে ভাইভা বোর্ডের সামনে হাজির হতেন ডিসি হওয়ার স্বপ্নচারীরা। তাদের সেখানে প্রমাণ করতে হতো ডিসি হওয়ার দৌড়ে তিনি কেন এগিয়ে। এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ছেড়ে জনপ্রশাসন এবার হাঁটছে অস্বচ্ছ পথে।
বিভিন্ন ব্যাচের উপসচিবদের ডেকে আনা হচ্ছে মোবাইল ফোনে। হাজির করা হচ্ছে বোর্ডের সামনে। ৭ এপ্রিল ভাইভা নেওয়া হয়েছে বিসিএস ২৮তম ব্যাচের প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তার। ২৯তম ব্যাচের কর্মকর্তারা হাজির হয়েছেন পরের দিন। ২৮তম ব্যাচের আরও কিছু কর্মকর্তাকে ডাকা হয় ৯ এপ্রিল। এভাবে পছন্দের প্রার্থীদের ডেকে ডেকে ভাইভা নেওয়ার ঘটনা চাউর হওয়ার পর প্রশাসনে শুরু হয়েছে তোলপাড়। বোর্ডের মুখোমুখি হওয়ার পর অনেক কর্মকর্তা তাদের ডাকার বিষয়টি জানাচ্ছেন নিজে থেকেই।
এমন একটা সময়ে ডিসি ফিটলিস্ট হচ্ছে, যখন চরম অস্থিরতা পার করে সবে থিতু হতে চলেছে প্রশাসন। সামাজিক অস্থিরতার পারদ ওঠানামা করছে এখনো। এই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোই চ্যালেঞ্জ বলে অভিমত প্রশাসনিক মহলের অনেকের। তাদের মতে, ভাইভায় এমন কর্মকর্তাদের ডাকা হয়েছে, যারা প্রশাসনে পরিচিত আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ও বিতর্কিত হিসেবে। তাদের ডাকায় ক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ। তাদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের ‘নীরব অনুসারী’ যেমন রয়েছেন, তেমনি আছেন দল নিরপেক্ষরাও। তাদের প্রশ্ন, আওয়ামী সুবিধাভোগী ও বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারতকারীদের কেন এ সময়ে ডিসি বানাতে হবে? তারা কেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর সামলাবে! নতুন সরকারকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করতে পারে তারা।
বিষয়টি জানা নেই বলে এড়িয়ে গেছেন জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, ‘সংশ্লিষ্ট কমিটি ভালো বলতে পারবে। তবে দ্রুত ডিসি নিয়োগ দিতে এটা হতে পারে সরকারের কৌশল।’
বিসিএস ২৮তম ব্যাচের ৪৮ কর্মকর্তাকে টেলিফোনে ডাকা হয়েছিল ডিসি ফিটলিস্টের ভাইভায়। এর মধ্যে হাজির হয়েছিলেন অন্তত ৪৫ জন। যাদের বেশিরভাগই আওয়ামী পরিবারের সন্তান। কেউ সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, কেউবা আওয়ামী লীগ নেতার সন্তান বা স্বজন। এমনকি লিস্টে নাম তোলার ডাক পেয়েছেন গত সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারাও।
শেখ হাসিনা সরকারের স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন আবদুল ওয়াদুদ দারা। তার একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন সফিকুল ইসলাম। ডিসি হতে তিনিও দিয়েছেন ভাইভা।
স্থানীয় সরকার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের দাপুটে সচিব ছিলেন হেলালুদ্দীন আহমদ। তার পিএস পিন্টু বেপারিও ছিলেন ডিসি ফিটলিস্ট তৈরির ভাইভা বোর্ডের সামনে। আওয়ামী লীগ সরকারের ধর্ম সচিবের পিএস মো. যুবায়ের; যিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতাও। তার বাবা আওয়ামী লীগ মনোনীত উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান। তিনিও হাজির হয়েছিলেন ভাইভা বোর্ডে।
আওয়ামী লীগ আমলে প্রশাসনে ছড়ি ঘুরিয়ে আলোচিত শায়লা ফারজানা। তার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ পদোন্নতি পদায়ন শাখায় (এপিডি উইং) দীর্ঘদিন কাজ করেছেন ভাস্কর দেবনাথ। তিনিও ডাক পেয়েছেন ডিসি হতে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারতে নেতৃত্ব দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা সায়মা আক্তার, এক উপজেলা আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদকের মেয়ে মৌসুমী সরকার রাখী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী শামীম বানু শান্তিও গিয়েছিলেন ভাইভায়।
জুনাইদ আহমেদ পলকের পিএস মুশফিকুর রহমান, কুমিল্লা আওয়ামী মহিলা লীগের এক নেত্রীর মেয়ে আয়শা হক, গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে গৌতম বাড়ৈ, ছাত্রলীগ নেতা কমল কুমার ঘোষসহ কট্টর আওয়ামী পরিবারের অন্তত এক ডজন কর্মকর্তা ডিসি হতে ডাক পেয়ে অংশ নিয়েছেন ভাইভায়। এর এক দিন পর ডাকা হয় বিসিএস ২৯তম ব্যাচের ৩০ কর্মকর্তাকে। এ তালিকায়ও অন্তত ১০ থেকে ১২ কর্মকর্তা ছিলেন আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধাভোগী। যারা প্রশাসনে কোনো না কোনোভাবে আওয়ামী দলবাজ ও বিতর্কিত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত।
ডিসি হতে চান এমন একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা মনে করেন, অতীতে এভাবে ডিসি ফিটলিস্ট করার নজির নেই। নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে এই অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ডিসি ফিটলিস্ট তৈরির চেষ্টা খুবই দুঃখজনক। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা দলীয় ক্যাডারের মতো আচরণ করে প্রশাসনকে কলুষিত করেছেন, দলীয়করণ করতে সহায়তা করেছেন, তারা যদি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের সময়েও সমান সুযোগ পান, তাহলে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা গেল কোথায়? তাহলে প্রশাসনে কী পরিবর্তন বা সংস্কার হলো?
ভিন্নমত যারা ভাইভা দিয়েছেন এমন কর্মকর্তাদের। তাদের যুক্তি, বাবা-মা করতে পারেন আওয়ামী লীগ। সে কারণে সন্তানরা কেন হবে ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের যদি ডিসি হওয়ার যোগ্যতা থাকে, তাহলে না করাটা হবে অন্যায়। সরকার অন্যায়কে কেনে দেবে প্রশ্রয়। আওয়ামী লীগ সরকার দলীয়করণ করেছিল বলেই তো তাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে সাধারণ মানুষ। সে একই কাজ কেন করবে নতুন সরকার?
ডিসি হন উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা। সাধারণত মেধাবী কর্মকর্তারাই বসেন মাঠপ্রশাসনের এ পদে। বিভিন্ন সময় প্রত্যাহার করে নিয়োগ দেওয়া হয় নতুন ডিসি। হঠাৎ প্রয়োজন হলেই যেন ডিসি পদে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া যায়, সে কারণে তালিকা করা হয় যোগ্যদের; যা ডিসি ফিটলিস্ট নামে পরিচিত। যদিও গত কয়েকটি সরকারের মেয়াদে দেখা যাচ্ছে ডিসি করা হয় দলীয় বিবেচনায়।
ডিসি পদে পদায়ন নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মচারীগণের মধ্য হইতে উপসচিব পদে পদোন্নতি প্রাপ্তির এক বছর পর জেলা প্রশাসক পদে পদায়নের জন্য ফিটলিস্ট প্রণয়ন করা হইবে। ফিটলিস্ট প্রণয়নের ক্ষেত্রে উপপরিচালক, স্থানীয় সরকার বা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বা সচিব, জেলা পরিষদ বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, পৌরসভা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উভয় পদে মোট ন্যূনতম ২ (দুই) বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকিতে হইবে। পূর্ববর্তী ৫ (পাঁচ) বছরের বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনের রেকর্ড এবং সমগ্র চাকরিজীবনের শৃঙ্খলা প্রতিবেদন সন্তোষজনক হইতে হইবে। প্রকল্প ও ক্রয় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত জ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় সম্পর্কে জানা এবং বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা থাকিতে হইবে। ম্যাজিস্ট্রেসি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হইতে হইবে।’















