হাঙ্গেরিতে হারলেন ট্রাম্পও!

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভিক্টর অরবান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতেও বিভিন্ন দেশের নির্বাচনের আগে নানা মিত্রকে জানিয়েছেন প্রকাশ্য সমর্থন। তবে হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানকে নিয়ে তার অবস্থান ছিল একেবারেই ভিন্ন—এখানে ট্রাম্প যেন একজন ‘সমমনা’ নেতাকে বাঁচাতে হয়ে উঠেছিলেন মরিয়া।
এই লক্ষ্যেই ট্রাম্প কেবল তার ভাইস প্রেসিডেন্টকে হাঙ্গেরিতে পাঠিয়ে অরবানের পক্ষে প্রচারই চালাননি, নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দেন—‘প্রয়োজনে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে হাঙ্গেরির অর্থনীতিকে শক্তিশালী করব, যেমন আমরা অতীতে করেছি আমাদের মহান মিত্রদের জন্য।’
বার্তাটি ছিল একেবারেই স্পষ্ট। কিন্তু তা কাজে আসেনি।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানায়, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান রবিবার ‘বেদনাদায়ক’ নির্বাচনী ফল মেনে নিয়ে পরাজয় স্বীকার করেন, যার মাধ্যমে ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তিনি ছিলেন ডানপন্থী আন্দোলনের এক প্রভাবশালী মুখ, যার ঘনিষ্ঠতা ছিল ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে।
আংশিক সরকারি ফলাফলে দেখা যায়, বিরোধী নেতা পিটার মাগিয়ারের দল বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে, যা ইউরোপসহ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ফেলতে পারে বড় প্রভাব।
অরবান দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইউরোপের অন্যতম রক্ষণশীল ও অগণতান্ত্রিক নেতা হিসেবে। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে তিনি পিছিয়ে থাকলেও, তার দল যে নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করেছিল, তাতে ফলাফল নিয়ে ছিল সন্দেহ। কিন্তু ভোটের ব্যবধান এতটাই বড় ছিল যে কেন্দ্র-ডানপন্থী বিরোধী দল টিসজা সহজেই জয়ী হয়।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় উপকারভোগী হাঙ্গেরির জনগণ। তারা এখন দেশকে চরম ডানপন্থী কর্তৃত্ববাদ থেকে সরিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, রাশিয়া থেকে দূরত্ব বজায় এবং প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে এগিয়ে নিতে পারবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জ্যাকব লেভির মতে, ‘অরবানের পরাজয় শুধু অন্য দেশগুলোর জন্য আশা জাগায় না—এটি বাস্তব পরিবর্তনও আনবে, কারণ তিনি কাজ করছিলেন আন্তর্জাতিক ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক ধরনের কেন্দ্র ও অর্থায়নের উৎস হিসেবে।’
অরবানের শাসনে হাঙ্গেরি এক ধরনের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছিল, যেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী কাঠামোয় রূপান্তর করা হচ্ছিল। তার এই পরাজয় সেই বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য বড় ধাক্কা।
এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টি ও ডানপন্থী রাজনীতির অনেক নেতা, যাদের মধ্যে আছেন ট্রাম্পও। তিনি অরবানকে একাধিকবার হোয়াইট হাউস ও মার-এ-লাগোতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং প্রকাশ্যে প্রশংসা করেছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষক মিশেল গোল্ডবার্গ নির্বাচনের আগের দিন লিখেছিলেন, অরবান ‘ইলিবারেল গণতন্ত্র’ নামে একটি বিকল্প মডেল তুলে ধরেছিলেন, যা পশ্চিমা উদারনীতির বিপরীতে এক ধরনের খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী কাঠামো হিসেবে প্রভাব বিস্তার করে। যুক্তরাষ্ট্রের কনজারভেটিভ মহলেও এর প্রভাব ছিল ব্যাপক।
অরবান সরকার ক্ষমতা ব্যবহার করে সংস্কৃতি-রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ, একটি প্রখ্যাত উদারপন্থী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা, স্কুলে ‘সমকামী প্রচারণা’ নিষিদ্ধ করা এবং গণমাধ্যমকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। একসময় স্টিভ ব্যানন ‘ট্রাম্পের আগের ট্রাম্প’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, শক্তিশালী নেতা-কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার ধারণাকে তিনি সমর্থন করেন এবং অরবানের মডেলকে অনুসরণযোগ্য মনে করেন।
তবে শেষ পর্যন্ত সেই মডেল ব্যর্থ হয়েছে এবং জনগণই সেটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। যার ফলে অরবানের পরাজয় ট্রাম্পের জন্যও পরাজয় হিসেবেই এসেছে।















