প্রযুক্তির মোড়কে ঢাকা পড়ছে ভাওয়াইয়ার সুর
- নেই দক্ষ সংগঠক, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব
- শিল্পীরা পান না পর্যাপ্ত সম্মানী
- মন্ত্রণালয়ের নেই আলাদা পরিকল্পনা
- ভাওয়াইয়া গেয়ে চলে না সংসার
- বেতার শিল্পীকে চালাতে হচ্ছে ভ্যান
- তহবিলের অভাবে ভাওয়াইয়া অনুষ্ঠান নেই বেতারে

আগামীর গ্রাফিক্স
বাঙালির লোকসংস্কৃতির অন্যতম ও অবিচ্ছেদ্য অংশ ভাওয়াইয়া গান। প্রযুক্তির প্রসার আর আধুনিকতার মোড়কে অনেকটাই হারাতে বসেছে দেশের উত্তরাঞ্চলের গাড়িয়াল বা মইষালদের বিরহ ও প্রেমের এই গান।
শ্রোতার সংখ্যা তো কমেছেই, রয়েছে দক্ষ সংগঠকেরও অভাব। আবার এই গানের জন্য যে পরিমাণ সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন, সেটিও নেই।
অবস্থা দেখে মনে হয়, খাদের কিনারে পৌঁছে গেছে ভাওয়াইয়া চর্চা। আর এ অবস্থা থেকে উত্তরণে, নতুন প্রজন্মের কাছে এই ধারার গান পৌঁছে দিতে প্রচার-প্রসারের বিকল্প নেই।
ভাওয়াইয়া গানের যুবরাজখ্যাত কছিম উদ্দিনের উত্তরাঞ্চলেই এখন অস্তিত্বের সংকটে এই গান। আব্বাসউদ্দীন আহমেদের গাওয়া বিখ্যাত ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’দিয়ে পরিচিত জেলা কুড়িগ্রামেও এখন শুধু নামমাত্র চর্চা হয়।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে ভাওয়াইয়া গানের তালিম দেওয়া হয়। যদিও সেটা প্রয়োজনের তুলনায় নগন্য। আর বেসরকারিভাবে এই গানের তালিম দেওয়া হয় না বললেই চলে।
পুরো জেলা মিলে উলিপুর উপজেলার পাঁচপীর এলাকায় বাংলাদেশ ভাওয়াইয়া একাডেমিতে চলে এই গানের তালিম। অনুদানের ৫ শতক জমিতেই চলছে ভাওয়াইয়া চর্চা।
তবে এই একাডেমির অর্জন নেহাত কম নয়। এখান থেকে বের হয়েছেন ৬ গীতিকার ও ৪২ শিল্পী। তবে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের আক্ষেপ শিল্পী বের হরেও তৈরি হচ্ছে না দক্ষ সংগঠক। যারাই মূলত ভাওয়াইয়া গানকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন।
১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই একাডেমিতে সরাসরি তালিমের পাশাপাশি অনলাইনেও দেওয়া হয় ভাওয়াইয়ার দীক্ষা।
কথা হয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ভূপতি ভূষণ বর্মার সঙ্গে। তার মতে উত্তরের জেলাগুলোতে ভাওয়াইয়া শিল্পীর কোনো অভাব নেই। তবে অভাব আছে দক্ষ সংগঠকের। আর দক্ষ সংগঠকের অভাব হলে এক সময় ভাওয়াইয়া শিল্পীর অভাব হবে এবং ভাওয়াইয়া চর্চাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
কেন দক্ষ সংগঠকের অভাব, তা জানতে চাইলে ভূপতি জানালেন, পৃষ্ঠপোষকতা আর অভিভাবকদের অসচেতনার অভাব।
তার ভাষ্য, ‘এই লোকসংস্কৃতিতে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার- প্রসার ও পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। যাতে শিল্পীরা এই ভাওয়াইয়ার প্রেমে পড়েন, সেই প্রেম থেকে এর প্রসারে দক্ষ সংগঠক হয়ে ওঠেন। এই লোকসংস্কৃতি দিয়ে তাদের যেন অন্ন সংস্থান হয়।’
তিনিও সরকারি পৃষ্ঠপোষকার অভাবের বিষয়ে আক্ষেপ জানালেন।
ভূপতি বললেন, ‘রংপুর আঞ্চলিক বেতার কেন্দ্র ভাওয়াইয়া চর্চার আতুরঘর। কিন্তু ফান্ডের অভাবে আগের মতো সেখানে আর গান হয় না। ফলে শিল্পীরা সম্মানী পান না।’
পেশায় ভ্যানচালক হলেও তিনি রংপুর আঞ্চলিক বেতার কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত ভাওয়াইয়া শিল্পী উলিপুর উপজেলার পাঁচপীর এলাকার সংকর বর্মণ। কথা হয় তার সঙ্গেও।
জানালেন, শৈশবেই ভাওয়াইয়ার প্রেমে পড়েছিলেন। বয়স ৫০ পেরোলেও এখনো শেষ হয়নি ভাওয়াইয়া প্রেম, তাই হয়নি বিচ্ছেদও।
তিন সন্তানের সংসারে নানা সংগ্রাম করে চলতে হয়, ভাওয়াইয়া গান গেয়ে আর যাই হোক সংসার চলে না। আর তাই পেশা হিসেবে বেছে নিতে হয়েছে ভ্যান চালানোকে।
সংকর বলছিলেন, বছরে ৩ থেকে ৪ বার তিনি গান গাইতে যেতেন রংপুর আঞ্চলিক বেতার কেন্দ্রে। সেই গানের বিল ছাড় হতো ৩ থেকে ৪ মাস পরপর। যেটুকু সম্মানী মিলত তা রংপুর যাওয়া আসা আর থাকা খাওয়াতেই ফুরাত।
তার মতে, সরকার যদি গানের জন্য বাজেট বাড়ায়, শিল্পীদের দেখভালের দায়িত্ব নেয়, তাহলেই হয়তো নতুন প্রজন্ম এই গানের ব্যাপারে আগ্রহী হবে।
উত্তরের লোকসংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছেন রেডিও চিলমারী ৯৯.২০ এফএমের ব্যবস্থাপক বশির আহমেদ।
তার মতে, এই জনপদে অনেক গুণী ভাওয়াইয়া শিল্পী রয়েছেন, যারা ভাওয়াইয়ার প্রকৃত রস খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, এই শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করার মতো কেউ নেই। তাদের কদর নেই।
বাংলাদেশ বেতারের গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক শফিকুল ইসলাম শফি ভাওয়াইয়ার প্রচার- প্রসার কমে যাওয়া ও তরুণ প্রজন্মের আগ্রহে ভাটা পড়ার দায় দিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে।
মন্ত্রণালয়ের পাঠ পরিক্রমায় ভাওয়াইয়া গানের প্রশিক্ষণের কথা আলাদা করে উল্লেখ নেই। তাছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনের সম্প্রচার অনুষ্ঠানমালার তালিকায় লালনগীতি- জারি গানের জন্য আলাদা সময়সূচি বা চাংক নেই। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব তো রয়েছেই।
এ প্রসঙ্গেই কথা হয় কুড়িগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার জসীম উদ্দিনের সঙ্গে।
তার কাছে বড় সংকট পর্যাপ্ত বাজেট না থাকা। ভাওয়াইয়ার জন্য আলাদা ভবন না থাকাকেও দুষলেন তিনি।
তবে পুরাতন শহরে ২৫ শতক জায়গার ওপর একটি ভাওয়াইয়া একাডেমির প্রস্তাব করা হয়েছে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করে বললেন, ভবনটি হয়ে গেলে এই সংগীত চর্চার ব্যপ্তি বাড়বে।
















