আকবরের হিসাব-নিকাশের দিন আজ জাতীয় উৎসব
- নববর্ষের রঙে ঐকতানের সুর
- শোভাযাত্রায় নেই ‘মঙ্গল’ও ‘আনন্দ’
- বিতর্ক এড়াতে নতুন নাম দিয়েছে সরকার
- চারুকলার আয়োজনে ভিন্ন ভিন্ন পাঁচ মোটিফ
- শিল্পকর্মে মোরগ, হাতি, ঘোড়া ও দোতারা

প্রকৃতিকে বৈশাখী রঙে সাজিয়ে এলো ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সর্ববৃহৎ উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন বছর বরণে প্রস্তুত বাঙালি। এর আগে সোমবার চৈত্রসংক্রান্তির নানা আয়োজনে বিদায় ঘটেছে ১৪৩২ বাংলা বছরের।
পঞ্জিকার পাতা উল্টে ১৪৩২ থেকে ৩৩ সাল শুরু সাধারণ ঘটনা হলেও, বাঙালির জীবনে তা যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। কৃষি উৎসব বা রাজস্ব আদায় উপলক্ষে বাংলা সাল প্রবর্তন হলেও এর ব্যাপক প্রভাব আছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় চৈত্রসংক্রান্তি এবং পহেলা বৈশাখে আয়োজন হয় মেলা ও বান্নির।
১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত শিশুদের পত্রিকা ‘ধানশালিকের দেশ’মেলা নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা করেছিল, যেখানে বছর জুড়ে বাংলাদেশে ১ হাজার ২৯৩টি মেলা আয়োজনের তথ্য ছিল। আর ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ফাউন্ডেশন (বিসিক) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের মেলা’ নামে বইয়ে রয়েছে ১ হাজার ৩৮৭ মেলার তথ্য।
বাংলা সালের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, মোগল সম্রাট আকবর এই পঞ্জিকা প্রবর্তন করেন খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে। ফসলি বছরের ওপর ভিত্তি করে শুরু হওয়া এ গণনা একদিকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য ছিল প্রয়োজনীয়, অন্যদিকে কৃষক ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী হয়ে ওঠে। পরে দিনটিই হয়ে ওঠে ‘হালখাতা’, ব্যবসায়িক পুনর্গঠনের ক্ষণে; যা একসময় ছিল হিসাব-নিকাশের দিন, তা আজ পরিণত জাতীয় উৎসবে।
কারও কারও ধারণা, রাজা শশাঙ্কের রাজ্যভার নেওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আছে বাংলা সনের। তখন নতুন সাল গণনার পদ্ধতি তৈরি করে দেন জ্যোতির্বিদ ফতেউল্লাহ শিরাজি। এটিকে ফসলি সনও বলেন অনেকে। কারণ, ফসল তোলার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে এর হিসাব করা হয়। চাষবাসের কাজে কৃষক অনুসরণ করতেন প্রচলিত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসের গণনা।
পহেলা বৈশাখের অন্যতম ঐতিহ্য হালখাতা হলেও, সময়ের বিবর্তনে তা হারিয়েছে আবেদন। তবে ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে কোনো কোনো জায়গায় এখনো টিকে আছে এ রেওয়াজ। এখন শহর ও গ্রামের যেসব দোকানে হালখাতা করা হয়, তা মূলত সেই ঐতিহ্যের অনুকরণ।
বাঙালির বৈশাখ উদযাপন রাজনৈতিক হয়ে ওঠে মূলত পাকিস্তান শাসনামলে। ১৯৬১ সালে শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপন এবং তার সূত্র ধরে পরে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের জন্ম। আর ১৯৬৭ সালে রমনা পার্কে যে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হয়, তা পরে শহুরে পরিমণ্ডলে হয়ে ওঠে বাঙালির অন্যতম অনুষঙ্গ।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বছর ছাড়া সব পহেলা বৈশাখেই হয়েছে অনুষ্ঠানটি; নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়েছে সুরের মূর্ছনা আর কথামালায়। কভিডের দুই বছর রমনা বটমূলে যেতে না পারলেও, এ আয়োজন করা হয়েছে ভার্চুয়ালি। ২০০১ সালে ছায়ানটের বৈশাখ বরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। তাতে ১০ জন নিহত হন। এরপর থেকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেই হচ্ছে প্রতি বছর বর্ষবরণের এ কর্মসূচি।
অন্যদিকে আশির দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়েছিল; সেটি পরে রূপ নেয় মঙ্গল শোভাযাত্রায়। ২০১৬ সালে মেলে ইউনেসকোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি। কয়েক বছর ধরেই বর্ষবরণের শোভাযাত্রায় ‘মঙ্গল’শব্দটি থাকা নিয়ে আপত্তি আসে কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠীর কাছ থেকে।
মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরোধিতা আওয়ামী লীগের সময় থেকেই চলতে থাকে এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ওই সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই বিরোধিতা জোরালো হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে চারুকলার শোভাযাত্রার নাম থেকে বাদ দেওয়া হয় ‘মঙ্গল’শব্দ। নতুন নামকরণ হয় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’।
এবারের বর্ষবরণে ‘মঙ্গল’ ও ‘আনন্দ’- উভয় শব্দ বাদ দিয়ে নামকরণ করা হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে নাম পরিবর্তনের বিষয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী- ‘পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম নিয়ে যে বিতর্ক, আমরা তার অবসান চাই। চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়, তার যে যে বৈশিষ্ট্য আছে, সবই থাকবে।’
চারুকলার ‘বৈশাখী শোভাযাত্রার’ এবারের প্রতিপাদ্য- ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। এতে থাকবে পাঁচটি বিষয়ের ভিন্ন ভিন্ন মোটিফ। এ শিল্পকর্মের মধ্যে থাকছে- মোরগ, হাতি, পায়রা, দোতারা ও ঘোড়া।
মোটিফের ব্যাখ্যা দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন আজহারুল ইসলাম শেখ— ‘নতুন ভোর, নতুন দেশ, নতুন গণতন্ত্রের সূর্য উদিত হয়েছে, তাকে শুভকামনা জানাতেই আমাদের প্রতীকী মোরগ। এই প্রাণী যেমন আমাদের প্রভাতে সূর্য ওঠার আগে জাগিয়ে দিয়ে শুভকামনা জানায়, এ দেশে আমরাও শুভকামনা জানাই গণতন্ত্রের পুনরুত্থানকে। আমরা চাই, এ দেশে ফিরুক ন্যায়বিচার।’
অন্যদিকে বিগত দিনের প্রতিকূলতার সব ‘আবর্জনা’দূর করে ‘আরও মানবমুখী’ হওয়ার প্রত্যয় নিয়ে এবারও বর্ষবরণে প্রস্তুত সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। আজন্ম বাংলা সংস্কৃতির চর্চা ও প্রসারে নিয়োজিত এ সংগঠনের আহ্বান- ‘নির্বিঘ্নে সংস্কৃতি চর্চা করতে চাই আমরা।’
ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসার আক্ষেপ, ‘বাঙালি যখন আপন বর্ষবরণের আয়োজন করছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যুদ্ধবাজরা হাজার বছরের পারস্য সভ্যতার ধ্বংসলীলায় মত্ত, বিশ্ব জনজীবন বিপর্যয়ের সম্মুখীন। সব শঙ্কা-অনিশ্চয়তা-আতঙ্কের অবসান চায় ছায়ানট, একই সঙ্গে কামনা করে মানবজাতির শান্তি-কল্যাণ-স্বস্তি। স্বপ্ন দেখে, পৃথিবী জুড়েই ফুটবে মানবতা-সংহতি-সাম্য-সম্প্রীতির ফুল।’
সরকারের এক তথ্যবিবরণীতে জানানো হয়েছে, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) ও ছায়ানট রমনা বটমূলে ১৪ এপ্রিল সকালে আয়োজন করবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান আবশ্যিকভাবে শুরু হবে জাতীয় সংগীত ও ‘এসো হে বৈশাখ’গান পরিবেশনের মাধ্যমে। এ আয়োজনের রঙ ছড়িয়ে দিতে ব্যবস্থা করা হবে সব সরকারি-বেসরকারি টিভি ও রেডিওতে সম্প্রচারের।
আরও কর্মসূচি
নববর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ১৪ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী মেলা, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করবে বাংলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন। বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনও প্রতিষ্ঠানটির প্রাঙ্গণে ২০ এপ্রিল থেকে ১৪ দিনব্যাপী আয়োজন করবে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা।
নববর্ষ উপলক্ষে সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে ঐতিহ্যবাহী খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা ও শিশু পরিবারে আয়োজন করা হবে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে সব জাদুঘর ও প্রত্নস্থান।
এ ছাড়া সব জেলা ও উপজেলায় পহেলা বৈশাখে আয়োজন করা হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জেলা শহর ও সব উপজেলায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকজ মেলা ও শিক্ষার্থীদের রচনা প্রতিযোগিতা।
জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানসহ জেলা-উপজেলার আয়োজনেও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
















