রাসুল (সা.)-এর শপথ করা তিনটি চিরন্তন সত্য
- রাসুল (সা.)-এর শপথে প্রমাণিত তিনটি বাস্তব সত্য
- যে তিন বিষয়ে রাসুল (সা.) আল্লাহর নামে শপথ করেছেন

প্রতীকী ছবি
মানুষ সাধারণত মনে করে, দান করলে সম্পদ কমে যাবে, অন্যকে ক্ষমা করলে মর্যাদা নষ্ট হবে এবং কারও কাছে সাহায্য চাইলে সমস্যা সহজে সমাধান হবে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা এই ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসুলুল্লাহ (সা.) তিনটি বিষয়ে আল্লাহর নামে শপথ করে এমন এক চিরন্তন সত্য ঘোষণা করেছেন, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ গঠনে অনন্য দিকনির্দেশনা দেয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
ثَلَاثٌ أُقْسِمُ عَلَيْهِنَّ: مَا نَقَصَ مَالُ عَبْدٍ مِنْ صَدَقَةٍ، وَلَا ظُلِمَ عَبْدٌ مَظْلِمَةً فَصَبَرَ عَلَيْهَا إِلَّا زَادَهُ اللَّهُ عِزًّا، وَلَا فَتَحَ عَبْدٌ بَابَ مَسْأَلَةٍ إِلَّا فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِ بَابَ فَقْرٍ
অর্থ: ‘তিনটি বিষয়ে আমি শপথ করছি। সদকা করার কারণে কোনো বান্দার সম্পদ কমে না। কোনো ব্যক্তি জুলুমের শিকার হয়ে ধৈর্য ধারণ ও ক্ষমা করলে আল্লাহ তার সম্মান বৃদ্ধি করেন। আর যে ব্যক্তি মানুষের কাছে চাওয়ার দরজা খুলে দেয়, আল্লাহ তার জন্য দারিদ্র্যের দরজা খুলে দেন।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ১৬৭৩৯; জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৩২৫; সহিহুল জামে, হাদিস : ৩০২৫)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির কথা বলেছেন।
এক. সদকা সম্পদ কমায় না: এটি ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি। বাহ্যিক হিসেবে দান করলে অর্থ কমে যায় মনে হলেও আল্লাহ তাআলা তাতে বরকত দান করেন এবং বিভিন্নভাবে তার প্রতিদান দেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন,
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ
অর্থ: ‘আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত : ২৭৬)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে,
مَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
অর্থ: ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায় এবং প্রতিটি শীষে একশটি করে দানা থাকে।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত : ২৬১)
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, দানের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধির অর্থ কখনো বাস্তব সম্পদ বৃদ্ধি, কখনো বরকত বৃদ্ধি, আবার কখনো আখিরাতে বহুগুণ প্রতিদান লাভ। (শারহু সহিহ মুসলিম)
দুই. ক্ষমা মর্যাদা বাড়ায় : মানুষের ধারণা, প্রতিশোধ নিলে সম্মান প্রতিষ্ঠিত হয়। অথচ ইসলাম শিক্ষা দেয়, ন্যায়সঙ্গত প্রতিশোধের অধিকার থাকা সত্ত্বেও যে ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا ۗ أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ
অর্থ: ‘তারা যেন ক্ষমা করে এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?’ (সুরা নূর, আয়াত : ২২)
সুরা শুরার ৪০ আয়াতে বলা হয়েছে-
فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ
অর্থ: ‘যে ক্ষমা করে এবং সংশোধনের পথ অবলম্বন করে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন বছরের পর বছর নির্যাতনকারী শত্রুদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। যা ইসলামের ইতিহাসে ক্ষমার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তগুলোর একটি।
তিন. অকারণে মানুষের কাছে হাত পাতার অভ্যাস দারিদ্র্য ডেকে আনে : ইসলাম মানুষকে আত্মমর্যাদা ও কর্মনিষ্ঠার শিক্ষা দেয়। প্রকৃত প্রয়োজন ব্যতীত মানুষের কাছে চাওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى
অর্থ: `উপরের হাত (দানকারীর হাত) নিচের হাত (গ্রহণকারীর হাত) থেকে উত্তম।‘ (বুখারি, হাদিস: ১৪২৯; মুসলিম, হাদিস: ১০৩৩)
অন্য এক হাদিসে এসেছে,
مَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَّهُ اللَّهُ، وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللَّهُ
অর্থ: ‘যে আত্মসম্মান রক্ষা করতে চায়, আল্লাহ তাকে সম্মানিত রাখেন। আর যে অমুখাপেক্ষী হতে চায়, আল্লাহ তাকে অমুখাপেক্ষী করে দেন।’ (বুখারি, হাদিস: ১৪৬৯; মুসলিম, হাদিস: ১০৫৩)
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। প্রকৃত অভাবগ্রস্ত, ঋণগ্রস্ত, মুসাফির বা শরিয়তসম্মত কারণে সাহায্য প্রার্থনা করা নিষিদ্ধ নয়। বরং পবিত্র কোরআনের সুরা তাওবার ৬০নং আয়াতে জাকাতের হকদারদের মধ্যে অভাবগ্রস্তদের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিসে যে ভিক্ষাবৃত্তিকে নিন্দা করা হয়েছে, তা হলো অপ্রয়োজনীয়ভাবে মানুষের কাছে হাত পাতার অভ্যাস।
আজকের ভোগবাদী সমাজে এই হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সম্পদের বরকত চাইলে দান করতে হবে, সামাজিক সম্প্রীতি চাইলে ক্ষমাশীল হতে হবে এবং ব্যক্তি ও জাতির মর্যাদা রক্ষা করতে হলে কর্মমুখী ও আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। দান মানুষের হৃদয়কে উদার করে, ক্ষমা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে এবং আত্মমর্যাদা মানুষকে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিস ব্যক্তি, সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। যে ব্যক্তি এই তিনটি নীতি বাস্তব জীবনে ধারণ করবে, সে দুনিয়ায় সম্মান ও বরকত লাভ করবে এবং আখিরাতেও আল্লাহর বিশেষ প্রতিদানের আশা করতে পারবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




