ছয় বছরে মধু আহরণ সর্বনিম্ন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর দেশ-বিদেশে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধুর চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। তবে উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় রপ্তানি তো দূরের কথা, পূরণ হচ্ছে না স্থানীয় চাহিদা। ফলে খুচরা বাজারে প্রতি কেজির দাম প্রকারভেদে বেড়েছে ৩০০-৪০০ টাকা।
মৌয়ালরা বলছেন, অস্বাভাবিক দামের কারণে ক্রেতাদের কাছে মধু পরিণত হয়েছে দুর্লভ বস্তুতে। বাজারে খাঁটি মধুর সরবরাহে দেখা দিয়েছে ব্যাপক ঘাটতি। এ সুযোগে ভেজাল মধু বিক্রি করছেন একশ্রেণির ব্যবসায়ী। পরীক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় চড়া দামে মধু কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারাও। পাশাপাশি সুনাম ও ঐতিহ্য হারাতে বসেছে জিআই স্বীকৃতি পাওয়া সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধু।
অবশ্য বন বিভাগের দাবি, মধু আহরণে এ বছর বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হচ্ছে বনদস্যুদের পুনরুত্থান। এ কারণে এ বছর কমেছে মৌয়ালের সংখ্যাও। মৌয়াল কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই কমে যায় মধু আহরণও।
মধু আহরণ কমে যাওয়ার একাধিক কারণের কথা বলেছেন পরিবেশবিদ, মধু ব্যবসায়ী ও মৌয়ালরা। এর মধ্যে প্রধান কারণ হিসেবে তারাও উল্লেখ করেছেন বনদস্যুদের পুনরুত্থানের কথা। দস্যুদের ভয়, অব্যাহত চাঁদাবাজি, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় ও নির্যাতনের কারণে এবার বনেই যাননি অনেক মৌয়াল। ভয় উপেক্ষা করে যারা গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন মৌসুমের মাঝপথে।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে খলিশা, গরান, কেওড়া, বাইনসহ মধুর প্রধান উৎস গাছগুলোয় ফুটছে না পর্যাপ্ত ফুল। ফলে দিন দিন কমছে মৌচাকের সংখ্যাও। এ ছাড়া বনে অভয়ারণ্যের সীমানা বৃদ্ধি এবং মধু আহরণের সময়সীমা তিন মাস থেকে দুই মাসে নামিয়ে আনার কারণে কমেছে মৌয়ালদের প্রবেশযোগ্য বনাঞ্চল। মধু আহরণে বিপর্যয়ের এটিও একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা।
শরণখোলা উপজেলার উত্তর সাউথখালী গ্রামের মৌয়াল ইউনুস ফকির জানালেন, তারা দলে ছিলেন ১০ জন। মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে তাদের নৌকায় হানা দেয় বনদস্যু মেজো জাহাঙ্গীর বাহিনী। নৌকা থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় দুই মৌয়ালকে। মুক্তিপণ দাবি করা হয় ৩ লাখ টাকা। পরে দেড় লাখ টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনা হয় তাদের। এরপর আর মধু সংগ্রহ করতে যেতে পারেননি তারা। যে কদিন বনে ছিলেন তাতে মধু আহরণ হয়েছিল দুই মণ। একেকজন ভাগে পেয়েছেন মাত্র আট কেজি করে। নৌকার বিএলসি, মধু ও মৌয়ালের রাজস্ব, আনুষঙ্গিক ব্যয় এবং দস্যুদের চাঁদা মিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। কিন্তু মধু আহরণ করতে না পারায় পুরোটাই লোকসানে পড়েছেন তারা।
সুন্দরবন রক্ষায় কাজ করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. নূর আলম শেখ। সুন্দরবন রক্ষায় সংগঠনের সমন্বয়কারীও তিনি। তার আশঙ্কা, বনদস্যু দমন, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈজ্ঞানিকভাবে মধু আহরণের সঠিক সময় নির্ধারণ করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংকটে পড়বে এই শিল্প। পাশাপাশি জলবায়ু অভিযোজনমূলক বন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে না পারলে মৌমাছি ও মৌচাক সংরক্ষণও সম্ভব হবে না।
বন বিভাগের তথ্য বলছে, সুন্দরবনে সাধারণত মধু আহরণ মৌসুম শুরু হয় ১ এপ্রিল থেকে। চলে ৩১ মে পর্যন্ত। সে হিসাবে ২০২৬ মৌসুমে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে মধু আহরণ হয়েছে ৪২ দশমিক ১ টন। এর মধ্যে শরণখোলা রেঞ্জে ১৩ দশমিক ৩ টন এবং চাঁদপাই রেঞ্জে আহরণ হয়েছে ২৮ দশমিক ৮ টন। ১ হাজার ৪৫৩ জন মৌয়াল মিলে এই পরিমাণ মধু সংগ্রহ করেন। ২০২৫ মৌসুমে এই দুই রেঞ্জে মধু আহরণে গিয়েছিলেন ২ হাজার ২৫০ জন মৌয়াল। তবে মধু আহরণ হয়েছিল ৬৪ দশমিক ৭ টন। এ ছাড়া ২০২৪ মৌসুমে আহরণ হয়েছিল ১০০ টন, ২০২৩ মৌসুমে ৯৫, ২০২২ মৌসুমে ১০৫ এবং ২০২১ মৌসুমে ১০৪ দশমিক ৪ টন। মূলত ২০২১ সালের পর থেকে কমতে থাকে মধু আহরণের পরিমাণ।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর ভাষায়, দস্যুদের অব্যাহত চাঁদাবাজি, অপহরণ ও নির্যাতনের কারণে গভীর বনের যেসব এলাকায় মধুর প্রাচুর্য, সেসব এলাকায় যেতে পারেননি মৌয়ালরা। মৌসুমের মাঝপথে ফিরে এসেছেন অনেকে। চাঁদা দিতে দিতে অনেকে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব। চলতি মৌসুমে মধু কম আহরণ হওয়ার প্রধান কারণই হচ্ছে দস্যুদের পুনরুত্থান।




