তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এই সরকার কীভাবে গঠিত হবে, এর কাঠামো কেমন হবে— তা নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েই গেছে। কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পঞ্চদশ সংশোধনী মামলা আপিল বিভাগে বিচারাধীন। পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন অবস্থানও বিষয়টি রেখেছে জটিল করে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপি, জামায়াতসহ কয়েকটি পক্ষ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আপিল বিভাগ রায় দেন, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত বিধানগুলো আবার কার্যকর হয়েছে। ফলে এ সরকারব্যবস্থা ফিরে আসে। আদালত একই সঙ্গে জানিয়ে দেন, পরবর্তী নির্বাচন সামনে রেখেই এসব বিধান প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচিত হবে।
ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় ‘প্রধান উপদেষ্টা’ নিয়োগের জন্য একটি ধাপভিত্তিক বিকল্প কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রথম বিকল্প ছিল— সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি; দ্বিতীয়ত— তার আগের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি; তৃতীয়ত— সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতি; চতুর্থত— তার আগের আপিল বিভাগের বিচারপতি; পঞ্চমত— রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় যোগ্য নাগরিক এবং ষষ্ঠত— রাষ্ট্রপতি নিজেই। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হলেও বিষয়টি পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। যে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, সেটি নিয়ে মামলার চূড়ান্ত শুনানি এখনো শেষ হয়নি।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা বাতিল ঘোষণা করেন। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্তির বিধানও ছিল। তবে পুরো সংশোধনী বাতিল করা হয়নি। পরে সম্পূর্ণ সংশোধনী বাতিল চেয়ে আপিল করা হয়। বিষয়টি এখনো সর্বোচ্চ আদালতের বিবেচনায় রয়েছে।
বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল মনে করেন, ‘এ মামলার (পঞ্চদশ সংশোধনী) চূড়ান্ত রায়ের পরই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চূড়ান্ত কাঠামো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।’ তার ভাষ্য, আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত কারও পক্ষে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় ভবিষ্যতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপ কেমন হবে।
তবে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়ার মতে, ‘সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। চাইলে তারা সংসদেই আইন পাস করে বিষয়টির সমাধান করতে পারে। সেক্ষেত্রে আদালতের মামলাটি কার্যত গুরুত্ব হারাতে পারে।’
এদিকে বিএনপি তাদের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব ও নির্বাচনী ইশতেহারে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলেছে। দলটি চায় বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতি এ প্রক্রিয়ার বাইরে থাকুক। ভবিষ্যতের তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুরনো কাঠামোর মতো নাও হতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। তবে সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে রাখা আছে কয়েকটি বিকল্প। প্রথম ধাপে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের চেষ্টা করবে। সেই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে বিভিন্ন দলের প্রস্তাবিত নাম থেকে সমঝোতার ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টা বাছাই করা হবে। এরপরও সমাধান না হলে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের দুই বিচারপতিকে যুক্ত করে একটি বড় কমিটির মাধ্যমে ভোটাভুটির প্রস্তাব রয়েছে। জুলাই সনদে আরও বলা হয়েছে, সব প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধান অনুসরণ করা হবে। কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার সুযোগ থাকবে না।
পাশাপাশি বিচারপতিদের এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে ভোটাভুটির যে বিকল্প রাখা হয়েছে, তাতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বিএনপিসহ সাতটি রাজনৈতিক দল। তারা চায়, এক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকুক। এ প্রসঙ্গে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়ার অভিমত, ‘এখানেই বড় প্রশ্ন রয়েছে। শেষ পর্যন্ত যদি সংসদই প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করে, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে। এতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা দীর্ঘদিন পালন করেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে বিরোধ ও অবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে এ ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।
২০১১ সালের ১০ মে একটি রিট মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করেন। একই বছরের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে এ ব্যবস্থা বাদ দেয়। এরপর দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে তিনটি জাতীয় নির্বাচন হয়। এর মধ্যে ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি। এসব নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক দেখা দেয়। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।
এ দাবিতে আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো শাসনামল বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো আন্দোলন চালিয়ে যায়। কিন্তু সরকার তাদের দাবি মেনে নেয়নি। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যায় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল হয়।
বর্তমানে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনা নয়, বরং এর কাঠামো কেমন হবে, প্রধান উপদেষ্টা কীভাবে নির্বাচিত হবেন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে— এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্ব নিয়ে সামনে এসেছে।
সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার
আগামীর সময়কে বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন পঞ্চদশ সংশোধনীবিষয়ক মামলা নিষ্পত্তি
না হওয়া পর্যন্ত এর চূড়ান্ত রূপরেখা কী দাঁড়ায় তা বলা যাচ্ছে না। তবে তিনি মনে করেন,
বিষয়টি সুরাহার জন্য এখনো যথেষ্ট সময় আছে। এ ছাড়া সংসদ সদস্যরা চাইলে সংবিধান সংস্কার
পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে মৌলিক কাঠামোসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরাসরি সংস্কার আনতে পারেন।




