বিশ্বকাপের বল ও গোলকিপারদের ভুল

এবারের বিশ্বকাপের বল ট্রাইওন্ডা হাতে জো হার্ট। ছবি সংগৃহীত
এবারের বিশ্বকাপে গোলকিপারদের বীরত্ব চোখে পড়ার মত। স্পেনের মত শক্তিশালী দলও কেপ ভার্দের গোলকিপার ভোজিনহাকে ফাঁকি দিয়ে গোল করতে পারেনি। কুরাসাওয়ের গোলকিপার এলোয় রুম এক ম্যাচে করেছেন বিশ্বকাপের রেকর্ড সেভ।
বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে ইরানের আলিরেজাও করেছেন একের পর এক দুর্দান্ত সেভ।
এর পাশাপাশি, গোলকিপারদের ভুলে গোলও হজম করছে দলগুলো। ইংল্যান্ডের জর্ডান পিকফোর্ড ও সেনেগালের এদুয়ার্দ মেন্দির মত বিশ্বখ্যাত দুই গোলকিপার বলের নাগাল পেয়ে হাতে লাগাতে পারলেও, শেষ পর্যন্ত গোল হওয়া আটকাতে পারেননি।
আলজেরিয়ার লুকা জিদান আর্জেন্টিনা ও জর্ডানের বিপক্ষে হাত ফস্কে দুটি গোল হজম করেছেন। ইরাকের গোলরক্ষক আহমেদ বাসিলও কিলিয়ান এমবাপ্পের দূরপাল্লার শটটি স্পর্শ করেও আটকাতে পারেননি।
জো হার্ট ও ক্যাসপার স্মাইকেলের ব্যাখ্যা
এ নিয়ে বিবিসি স্পোর্টসে ইংল্যান্ডের সাবেক গোলকিপার জো হার্ট ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন,‘একটি বিশ্বকাপে এই ধরনের গোল আমি অনেক বেশিবার দেখছি। তার মানে এই ফুটবলটির (বল) মধ্যে নিশ্চিতভাবেই কোনো গোলমাল আছে।’
তিনি আরও যোগ করেন,‘শীর্ষ স্তরের ফুটবলে আপনি কতবার দেখেন যে গোলকিপার বল স্পর্শ করার পরেও গোল হয়ে যাচ্ছে? এই টুর্নামেন্টে আমি লক্ষ্য করছি, গোলকিপাররা কাঁধের ওপর দিয়ে বল স্পর্শ করতে পারলেও তা আটকে রাখতে পারছেন না। বলের মধ্যে কোনো একটা রহস্য অবশ্যই আছে।’
‘ট্রাইওন্ডা’ নামের এই বলটি কি সত্যিই এত বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে? ডেনমার্কের সাবেক গোলকিপার ক্যাসপার স্মাইকেল দিলেন এর জবাব,‘বল তৈরিই করা হয় গোল করার জন্য। এই বলটির মূল বিষয় হলো এর গঠন। এবার এটি মাত্র চারটি প্যানেল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এতে কোনো সেলাই নেই—পুরোটা একসঙ্গে জোড়া লাগানো। যখন আপনি এর সঙ্গে আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং বাতাসের ঘনত্বকে মেলাবেন, তখন দেখবেন বলটির ওপর বাতাসের বাধা (ড্র্যাগ) কম কাজ করে। যার মানে এটি খুব বেশি স্পিন করে না, তবে আমি লক্ষ্য করেছি এটি চোখের পলকে কিছুটা বেশি গতি পায় এবং আমরা মাঠে ঠিক সেটাই দেখছি।’
তিনি আরও যোগ করেন,‘বেশ কয়েকটি গোলের ক্ষেত্রে দেখা গেছে গোলকিপাররা বলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন—যেমন ক্রোয়েশিয়ার প্রথম গোলের ক্ষেত্রে পিকফোর্ড, মেসির বিপক্ষে লুকা জিদান এবং এমনকি এমবাপ্পের বিপক্ষে এদুয়ার্দ মেন্দি। আসলে এই বলগুলোর মূল ব্যাপার হলো, দর্শকরা গোল দেখতে চান, তাই বলগুলো তৈরিই করা হয় বেশি গোল হওয়ার জন্য।’
পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা
অপটা-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গোলকিপারদের ভুলের কারণে গোল হজম করার সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর এই আসরে এখন পর্যন্ত এমন ১১টি ভুল হয়েছে—যা গত সাতটি বিশ্বকাপের যেকোনোটির গ্রুপ পর্বের চেয়ে বেশি।
জো হার্ট বা স্মাইকেল যাই বলুন, পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। বলে আচমক গতি বাড়লে বক্সের বাইরে থেকে শট নেওয়ার প্রবণতা বাড়ত। সেটা কিন্তু হয়নি।
অপটার পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৬৬ বিশ্বকাপে বক্সের বাইরে থেকে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে শট নেওয়া হয়েছিল গড়ে ২২.৩টি। ১৯৭০ সালে সেটা ছিল ম্যাচ প্রতি গড়ে ২৫.৩ আর ১৯৭৪ বিশ্বকাপে ২০.১টি। সেখানে এবারের বিশ্বকাপে বক্সের বাইরে থেকে পোস্টে শট নেওয়া হয়েছে গড়ে মাত্র ৯.২টি।
বেড়েছে গোলকিপারদের সেভ
লক্ষ্যে শটও তুলনায় কম। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে লক্ষ্যে শট ছিল গড়ে ১০.৯, ১৯৭০-এ ১১.৩, ১৯৭৪-এ ১১.৯টি সেখানে এবারের গ্রুপ পর্বে সেটা ৮.৫টি। বরং গত দুই আসরের চেয়ে গোলকিপাররা সেভও করছেন বেশি।
২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে গোলকিপাররা ম্যাচ প্রতি গড়ে সেভ করেছেন ৫.১টি, সেখানে এবার সেই পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৫.৬। এক ম্যাচে সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ডও হয়েছে এবার। তাই বেশি গেলের দায় ঢালাওভাবে বলের ওপর চাপিয়ে দেওয়াটা বাড়াবাড়িই।




