‘উনি ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যান নাই’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘আপনি নগদ প্রাপ্তির কথা বললেন। ভাই, এ সমস্ত প্রশ্ন করবেন না, আমরা খুব বিব্রতবোধ করি। এখানে উনি (প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান) ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যান নাই। এখানে গেছেন দুই দেশের সম্পর্কের অভিমুখ, তার কনটেন্ট এবং তার উচ্চতা, ব্যাপ্তি ও গভীরতা— এটা এস্টাবলিশ করার জন্য। বাকিগুলি পরে আসবে। কোনোদিন সরকারপ্রধান আরেক সরকারপ্রধানের সঙ্গে দিস্তা কাগজ নিয়ে, পেনসিল নিয়ে বসে না। ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যায় না ভাই। একটু আত্মসম্মান রাখেন। আমরা অন্য জায়গায় পৌঁছে গেছি। এটা বিশ্বাস করুন। এগুলো খুব বিব্রতকর প্রশ্ন।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের ‘নগদ কী পেয়েছেন’ প্রশ্নে এমন জবাব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তার এই জবাব তাৎক্ষণিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকেই তার প্রশংসা করেছেন। এটি আসলে কোনো কুণ্ঠা ছাড়াই বলা যায়, যে উত্তর খলিলুর রহমান দিয়েছেন, তা শুধু একজন কূটনীতিকের দক্ষতার বিষয় নয়; বরং একটি জাতির আত্মসম্মানের প্রতিফলন।
খলিলুর রহমান ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তারেক রহমান টেকনোক্র্যাট কোটায় তাকেই পছন্দ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে। তারেক রহমান কেন তাকে বেছে নিয়েছেন, তা নিয়ে নানা সময়ে নানা আলোচনা হয়েছে। কেউ কেউ এক্ষেত্রে প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষায় তাকে যথেষ্ট কার্যকরী বলে উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ তাকে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী হিসেবে দেখেন। আবার কারও মতে, খলিলুর রহমানকে রেখে দিয়ে তারেক রহমান প্রমাণ করেছেন, কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা ও দক্ষতার মূল্যায়ন রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে। এটি একটি পরিণত সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশ আজ আর সেই ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নয়, যে তকমা স্বাধীনতার পরপরই কেউ কেউ লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ক্ষুধা-দারিদ্র্যের প্রতীক হিসেবে যে দেশকে বিশ্ব একসময় চিনত, সে দেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছানোর দোরগোড়ায়
বাংলাদেশ আজ আর সেই ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নয়, যে তকমা স্বাধীনতার পরপরই কেউ কেউ লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ক্ষুধা-দারিদ্র্যের প্রতীক হিসেবে যে দেশকে বিশ্ব একসময় চিনত, সে দেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছানোর দোরগোড়ায়। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু হওয়া পরিবর্তন গত আড়াই দশকে ত্বরান্বিত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, তৈরি পোশাকশিল্পের বিস্ময়কর সাফল্য, রেমিট্যান্সের স্থিতিশীলতা এবং মানবসম্পদের উন্নয়ন— এসব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন আর শুধু সাহায্যপ্রার্থী নয়; বরং সম্ভাবনাময় অংশীদার।
আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশই একা চলতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে আফ্রিকার গরিব দেশ বুরুন্ডি— সবাই আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। পার্থক্য শুধু মাত্রায়। এ বাস্তবতায় তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি জড়িত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। মালয়েশিয়া ও চীন সফর তারই বহিঃপ্রকাশ।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ঐতিহাসিক গভীরতা রয়েছে। লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক সেখানে কর্মরত। রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ আসে মালয়েশিয়া থেকে। শ্রমিকদের অধিকার, দক্ষতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা— এসব ক্ষেত্রে সম্পর্ককে আরও গভীর ও সুষম করার সুযোগ রয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বহুমাত্রিক। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য ভারসাম্য, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং রাজনৈতিক সহযোগিতা— এসব ক্ষেত্রে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তবে এ সম্পর্ককে শুধু ঋণনির্ভরতায় আটকে রাখা যাবে না। বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে, বিনিয়োগ যেন জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়।
খলিলুর রহমানের উত্তরে যে আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠেছে, তা এই নতুন বাস্তবতারই প্রতিফলন। সরকারপ্রধানরা কখনো ‘দিস্তা কাগজ ও পেনসিল’ নিয়ে বসেন না, ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যান না। তারা সম্পর্কের অভিমুখ, কনটেন্ট, উচ্চতা, ব্যাপ্তি ও গভীরতা নির্ধারণ করেন’— এ দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের কূটনীতিকে পুরনো ‘দাতা-গ্রহীতার মডেল’ থেকে সমান অংশীদারত্বের মডেলে রূপান্তরিত করার সংকেত দেয়।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্য শক্তিশালী অ্যাক্টরগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করা খলিলুর রহমানের মতো অভিজ্ঞ কূটনীতিকের জন্যও সহজ কাজ নয়। চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন— এসব বিষয় সূক্ষ্মভাবে সামলাতে হবে। তারেক রহমানের সরকারের লক্ষ্য যদি হয় অর্থনৈতিক কূটনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া, তাহলে প্রতিটি সফরকে ফলপ্রসূ করতে হবে বাস্তবায়নযোগ্য চুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে। শুধু সম্পর্কের ঘোষণা নয়, ফলাফল দরকার।
মালয়েশিয়া-চীন সফরের আউটকাম যদি হয় শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য অধিকার, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, অবকাঠামো প্রকল্পে স্বচ্ছতা এবং বিভিন্ন সেক্টরে প্রযুক্তি ও দক্ষতা হস্তান্তর, তাহলে তা সত্যিকার অর্থে সফল বলা যাবে। এ সফরগুলোকে শুধু ব্যক্তিগত কূটনীতি নয়, জাতীয় স্বার্থের কূটনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই নতুন কূটনৈতিক অভিযান যদি ধারাবাহিকতা পায় এবং ফলপ্রসূ হয়, তাহলে বাংলাদেশ শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, আন্তর্জাতিক মর্যাদায়ও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
এ সফরগুলো তাই শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নয়, বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের পুনর্নির্মাণেরও অংশ। খলিলুর রহমানের সেই সোজাসাপ্টা জবাব আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে— আমরা এখন অন্য জায়গায় পৌঁছে গেছি। এটা বিশ্বাস করতে হবে। আর এ বিশ্বাসের ভিত্তিতেই এগোতে হবে সামনের দিকে।
লেখক: উপসম্পাদক, আগামীর সময়




