অসহায়দের পাশে অন্তর হাজং

শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন অন্তর হাজং । ছবি: আগামীর সময়
নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী উপজেলা কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর। পাহাড়, টিলা, বন ঘেরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এই জনপদে বেকারত্ব, চিকিৎসার অভাব, শিক্ষাবঞ্চনা, বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল সব মিলিয়ে জীবন যেন কঠিন সংগ্রামের আরেক নাম। এই এলাকার মানুষের সমস্যা আর বিপদে ভরসা হয়ে উঠেছেন অন্তর হাজং।
দুর্গাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী খুজিগড়া গ্রামের বাসিন্দা রহিন্দ্র হাজংয়ের ছেলে অন্তর হাজং (৩০) ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন। অন্তরের পরিবারে বাবা-মা, তিন ভাই ও এক বোন রয়েছে। ভাইবোনদের মধ্যে তিনি সবার ছোট।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এলাকার বহু শিশু অর্থাভাবে স্কুলে যেতে পারে না। সেসব দরিদ্র শিক্ষার্থীকে সহায়তা দেওয়া, ফরম পূরণের অর্থ জোগানো, অসহায়-অসুস্থদের চিকিৎসার ব্যবস্থা, বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ, শীতবস্ত্র বিতরণসহ মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে ছাত্রজীবন থেকে মানুষকে সচেতন করে আসছেন অন্তর হাজং।
সম্প্রতি সরেজমিন কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী গ্রাম ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে শিক্ষার হার কম। বিশেষ করে দরিদ্র ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারের অনেক শিশুই মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। এই বাস্তবতায় অন্তর হাজং ও তার সহযোগীরা কয়েক বছর ধরে শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ, স্কুলে ভর্তি সহায়তা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে আসছেন।
অন্তর হাজং প্রাইভেট পড়িয়ে যে টাকা আয় করেন তার একটি অংশ এ কাজে ব্যয় করেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহযোগিতার আবেদন, কখনো ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে সার্বিক কার্যক্রম চালান।
কলমাকান্দার লেংগুড়া এলাকার সুস্মিতা নামে এক শিক্ষার্থী জানিয়েছে, বাবার আর্থিক সংকটের কারণে তার পড়াশোনা বন্ধের উপক্রম হয়েছিল। অন্তর হাজংয়ের সহায়তায় আবার স্কুলে ফিরতে পেরেছে সে।
শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে এলাকায় সচেতনতামূলক বৈঠকও করেন অন্তর। বিশেষ করে মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করার কাজ করছেন নিয়মিত। কলমাকান্দার পাঁচগাঁও গ্রামের বাসন্তী রানী বললেন, ‘আমার স্বামীর চিকিৎসার জন্য দিশাহারা ছিলাম। অন্তর আমাদের হাসপাতালে নেওয়া থেকে শুরু করে অর্থ সংগ্রহ পর্যন্ত অনেক সাহায্য করেছেন।’ ভারতের মেঘালয়ের পাহাড় ঘেঁষা কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলা প্রায় প্রতি বছরই পাহাড়ি ঢল ও বন্যার কবলে পড়ে। হঠাৎ বন্যায় অনেকে ঘরবাড়ি হারান, খাদ্যসংকটে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে ত্রাণ বিতরণসহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ান অন্তর হাজং। স্থানীয় তরুণদের নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক। বন্যা বা দুর্যোগের সময় তারা নৌকায় করে দুর্গম এলাকায় গিয়ে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করেন।
দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া এলাকার স্কুলশিক্ষক জ্যোতির্ময় সাংমা বলেছেন, ‘মানবিক কাজের ক্ষেত্রে অন্তরের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আন্তরিকতা। কোনো প্রচারের জন্য নয়, মানুষের কষ্ট দেখেই সে কাজ করে।’
হাজং সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং তাদের অধিকার সচেতনতা নিয়েও কাজ করছেন অন্তর। সেই লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ভাষা-সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজনের উদ্যোগ নেন তিনি।




