অরক্ষিত বিএমডিএ কূপ
সাজিদের পর এবার মহিষের প্রাণহানি

এই পরিত্যক্ত কূপে পড়েই মারা গেছে মহিষটি। ছবি: আগামীর সময়
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) একটি অরক্ষিত পরিত্যক্ত কূপে পড়ে মারা গেছে একটি মহিষ।
গত বছরের ডিসেম্বর মাসে তানোরে একই ধরনের একটি উন্মুক্ত কূপে পড়ে মারা গিয়েছিল দুই বছরের শিশু সাজিদ। সেই ঘটনা তোলপাড় তুলেছিল সারা দেশে। পরে পরিত্যক্ত বোরহোল দ্রুত বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও বাস্তবে অনেক কূপ এখনো রয়ে গেছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই অবহেলারই আরেকটি মর্মান্তিক পরিণতি ঘটেছে এবার।
শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের শাহানাপাড়া গ্রামের ঘটনা এটি। খবর পেয়ে গোদাগাড়ী ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান চালালেও প্রায় ৮০ ফুট গভীর কূপ থেকে মহিষটিকে উদ্ধার সম্ভব হয়নি। রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় চার ফুট ব্যাসের কূপটির গভীরে পড়ে আছে মহিষটি। টর্চলাইটের আলোয় সেটিকে দেখা গেলেও ছিল না কোনো নড়াচড়া। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের ধারণা, কূপে পড়েই মৃত্যু হয়েছে প্রাণীটির।
মহিষটির মালিক বিকাশ খা খা, যিনি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওঁরাও সম্প্রদায়ের একজন কৃষক। দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে দুটি মহিষ কিনেছিলেন তিনি। ওই মহিষ দিয়ে হালচাষ করেই চালাতেন সংসার। এখনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ শেষ হয়নি। প্রতি মাসে তাকে ১৫ হাজার টাকা করে কিস্তি দিতে হয়। দুটি মহিষের একটি মারা যাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন তিনি।
বিকাশের মেয়ে মন্দিরা খা খা জানান, বিকেলে মহিষটি দৌড়ে গিয়ে কূপে পড়ে যায়। খবর পেয়ে তার বাবা ঘটনাস্থলে এসে মহিষের অবস্থা দেখে অচেতন হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয়রা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মন্দিরা বলেন, ‘আমাদের বড় সংসার। বাবা মহিষ দিয়ে হালচাষ করে সংসার চালান। এখন একটি মহিষ মারা যাওয়ায় সংসার কীভাবে চলবে, বুঝতে পারছি না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে মালিগাছা গ্রামের বাশির উদ্দিন বাবুসহ কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ নেন। কূপ খনন করা হলেও পরে কাজ আর এগোয়নি। তবে খনন করা কূপটি নিরাপদভাবে বন্ধও করা হয়নি। তাদের দাবি, এই অবহেলার কারণেই কৃষকের এমন ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও দাবি জানান তারা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাশির উদ্দিন বাবু বলেন, জমির মালিক প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে কাজ শুরু হবে, এমন আশা থেকেই কূপটি বন্ধ করা হয়নি। মহিষের মৃত্যুর ঘটনা শুনেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি অন্য উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করবেন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর তানোর উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে মায়ের সঙ্গে হাঁটার সময় খড় দিয়ে ঢেকে রাখা একটি অরক্ষিত গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে যায় দুই বছরের শিশু সাজিদ। টানা প্রায় ৩২ ঘণ্টার উদ্ধার অভিযান শেষে ১১ ডিসেম্বর রাতে প্রায় ৫০ ফুট গভীর গর্ত থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। পরে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
সাজিদের মৃত্যুর পর আট জেলার জেলা প্রশাসকদের পরিত্যক্ত বোরহোল দ্রুত বন্ধের নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠান রাজশাহী বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার। এরপর কিছু কূপ বন্ধ হলেও গোদাগাড়ীর শাহানাপাড়ার এই কূপটি ছিল উন্মুক্ত অবস্থায়।




