সরষের মধ্যে ভূত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) শুধু কর আদায়ের যন্ত্র নয়, রাষ্ট্রের আইনি অভিভাবকও। প্রতিষ্ঠানটি সাধারণের ওপর চাপ এবং প্রভাবশালীদের ছাড় দিচ্ছে। তাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা চাপাচ্ছে, ভ্যাট বসাচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর। অন্যদিকে, আইনি মারপ্যাঁচে শক্তিশালী মহলের হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকি তারা রুখতে পারছে না। এটি শুধু রাজস্ব ব্যবস্থার অদক্ষতাই নয়, বরং চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক পরিসংখ্যানে জানা যাচ্ছে, ২০২৩-২৪ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৫৪০টি মূল্য সংযোজন কর-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি হয়। সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে ৩ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা দাবি করা হলেও রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৫৫ কোটি ২৪ লাখ। এ পরিংখ্যান হতাশার উদ্রেক করে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসও উদ্বিগ্ন।
অধিকাংশ মামলায় সরকারের হেরে যাওয়ার অর্থ সেখানে গড়বড় আছে, লুকিয়ে আছে সরষের মধ্যে ভূত! সরকারের হেরে যাওয়ায় প্রমাণিত হয় দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগসহ কর্মকর্তাদের অদক্ষতা, অযোগ্যতা বা অসাধুতা। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকার পক্ষ হারলে সামনে অনেক প্রশ্ন হাজির হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগের অসদুদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে গিয়েই কি এমন স্বেচ্ছায় হেরে যাওয়া? রবিবার ‘আগামীর সময়’ কর মামলার কাহিনি উল্লেখ করতে গিয়ে জানিয়েছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ‘েস্বচ্ছায় হেরে হাজার কোটি টাকা হাতছাড়া সরকারের!’
রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় প্রাথমিক দায়িত্ব রাজস্ব কর্মকর্তাদের। তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, মামলা করার প্রক্রিয়ায় ত্রুটি এবং আইনের ভুল ব্যাখ্যা দেওয়ার কারণেই মূলত হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এ ছাড়া রয়েছে সময়সীমা লঙ্ঘন, নোটিস জারিতে অনিয়ম এবং নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা। এ কারণে মামলার আদেশ চলে যাচ্ছে কর ফাঁকিবাজদের পক্ষে। সম্প্রতি বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং প্রভাবশালী করদাতাদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে এনবিআরের একের পর এক পরাজয় দেশের রাজস্ব প্রশাসনের বেহাল দশাকেই নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।
এনবিআরের যে বড় দুর্বলতাটা সামনে এসেছে তা হলো— যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও আইনি ভিত্তি ছাড়াই অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে বা খেয়ালখুশিমতো কর বা শুল্ক দাবি করে মামলা ঠুকে দেওয়া। পরবর্তীকালে যখন উচ্চ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে এ মামলাগুলো ওঠে, তখন দক্ষ আইনজীবীদের সামনে এনবিআরের আনা অভিযোগগুলো বালির বাঁধের মতো ধসে পড়ে।
একটি সরকারি মামলা হেরে যাওয়ার পর কার গাফিলতিতে বা কোন দুর্বল নথির কারণে রাষ্ট্র হারল, তার কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা জবাবদিহি এনবিআরে দেখা যায় না। সরকারের সব যন্ত্রেই জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে কর্মকর্তারাও মামলার গুণগত মান নিয়ে মাথা ঘামান না। এনবিআরের নিজস্ব গাফিলতি ও দুর্বলতায় রাষ্ট্রের এ বিশাল আর্থিক ক্ষতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এ ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতিতে এনবিআরের কোনো কোনো অসাধু কর্মকর্তা কর ফাঁকিবাজদের সঙ্গে আঁতাত করে এমন অপকর্ম করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে কি না, তা তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রাখে।
আইনি দুর্বলতার অজুহাতে হাজার কোটি টাকা সরকারের হাতছাড়া হওয়া কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ভুল নয়— এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং জনগণের আমানতের খেয়ানত। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে দাঁড়িয়ে এনবিআরকে অবশ্যই এই আইনি দুর্বলতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।




