এশিয়ার ক্ষুদ্রতম মা এখন স্বাবলম্বী

এশিয়ার ক্ষুদ্রতম মা মাসুরা বেগম
উচ্চতা মাত্র ৩ ফুট ৪ ইঞ্চি। এই একটি বৈশিষ্ট্যই একসময় তাকে আলাদা করে চিনিয়ে দিত। কিন্তু আজ মাসুরা বেগম পরিচিত তার সাহস, সংগ্রাম, ভালোবাসা ও স্বাবলম্বীর জন্য। এশিয়ার ক্ষুদ্রতম মা হিসেবে পরিচিত এই নারী এখন নিজের পরিবার নিয়ে দিব্যি ভালো আছেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, রাজশাহীর পবা উপজেলার বজরাপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাসুরার একটি পাকা ঘর, সামনে ছোট্ট মুদির দোকান। স্বামী মনিরুল ইসলাম ও একমাত্র মেয়ে মরিয়মকে নিয়ে তার সংসার কাটছে ভালোই। একসময় যে পরিবারটির মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, আজ তারা ঘর ও আয়ের পথ— দুটিই পেয়েছে। মাসুরা এখন শুধু গৃহিণী নন, একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাও। দোকান সামলানোর পাশাপাশি পালন করছেন ছাগল, হাঁস-মুরগি ও কবুতর। ফলে পরিবারে তৈরি হয়েছে একাধিক আয়ের উৎস। সব মিলিয়ে এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো আছেন পরিবার নিয়ে। ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই। রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন মনিরুল ইসলাম ও মাসুরা খাতুন দম্পতিকে তৈরি করে দেয় একটি দোকানঘর।
মাসুরা বললেন, ‘একসময় আমাদের অনেক কষ্ট ছিল। ঠিকমতো খাওয়ারও কষ্ট হতো, থাকার জায়গা ছিল না। এখন নিজের ঘর আছে, দোকান আছে। আমরা এখন ভালো আছি, শান্তিতে আছি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় সুখ।’
স্বামী মনিরুল ইসলামও একইভাবে জীবনের এই পরিবর্তনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বললেন, ‘আমরা অনেক কষ্ট করে এ পর্যায়ে এসেছি। এখন নিজের একটা দোকান আছে, কিছু আয় হচ্ছে— এটাই আমাদের জন্য অনেক বড় ব্যাপার। আমরা এখন ভালোভাবে সংসার চালাতে পারছি।’
তবে তাদের এ অবস্থায় পৌঁছার পথটা সহজ ছিল না। স্মৃতিচারণ করেন মনিরুল, ‘আমি ইটভাটায় কাজ করতে এসে প্রথম ওকে দেখি। ওর উচ্চতা দেখে মানুষ যেভাবে ভাবত, আমি সেভাবে ভাবিনি। আমার কাছে ওর মনটাই বড় ছিল।’
‘ধীরে ধীরে ভালোবাসা হয়। ২০০৩ সালে বিয়ে করি। কিন্তু বিয়ের সময় অনেক বাধা এসেছে। ওর পরিবার ভয় পেত— আমি নাকি ওকে ছেড়ে চলে যাব। বিয়ে করার পর প্রথমে মাসুরার পরিবার আমাদের মেনে নেয়নি। এমনকি আমাকে বেশ কয়েকবার মারার জন্য এসেছিল। পরে ধীরে ধীরে তার পরিবার মেনে নেয়। এখন আর কোনো সমস্যা নেই’— বলছিলেন মনিরুল।
স্মৃতিচারণ করেন মাসুরা, ‘আমরা বিয়ের পর অনেক জায়গায় লুকিয়ে থেকেছি। একসময় আমাদের ওপর হামলার চেষ্টাও হয়েছিল। তখন খুব ভয় লাগত; কিন্তু আমরা একে অন্যকে ছাড়িনি। কষ্ট ছিল, কিন্তু ভালোবাসা ছিল আকাশছোঁয়া।’
মাসুরার মাতৃত্বও ছিল এক বিরল ঘটনা। গর্ভধারণের সময় তার ওজন ছিল মাত্র ১২ কেজি, যা প্রসবের সময় বেড়ে দাঁড়ায় ২২ কেজিতে। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ২০১৩ সালের ৯ জুন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন মাসুরা।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের চিকিৎসক নূর-এ-আতিয়া বলেছেন, ‘এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিরল একটি কেস ছিল। রোগীর শারীরিক গঠন ছোট হওয়ায় আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করি। বিভাগীয়প্রধান নিজে অস্ত্রোপচার করেন। আলহামদুলিল্লাহ, এখন মাসুরার মেয়েটিও বড় হয়েছে। মাসুরাও ভালো আছেন। তারা ভালো আছেন শুনে চিকিৎসক হিসেবে আমাদেরও ভালো লাগে।’ মাসুরার স্বপ্ন, ‘আমার মেয়ে যেন ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারে, মানুষ হতে পারে। আমি চাই, ও যেন আমার মতো কষ্ট না পায়।’




