নিউ ইয়র্কের ব্যস্ত রাজপথে মেসি-রোনালদোর গল্প

সংগৃহীত ছবি
ফ্যান জোনে ফুটবল উত্তাপ
কুইন্সের ফ্লাশিং মিডো করোনা পার্কের ফিফা ফ্যান জোনে যখন পৌঁছালাম তখন ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে ৬টা। ঢাকার হিসেবে সন্ধ্যা নেমে যাওয়ার কথা, নিউ ইয়র্কের হিসেবে দিনের মাঝামাঝি বললে ভুল হবে না। রাত ৯টার সময়ও সূর্যের আলো ধিকি ধিকি করে জ্বলে এই শহরে, তবে সেটা গ্রীষ্মে। পর্তুগাল-কলম্বিয়ার খেলা। বাঁশি বাজার আগে ভেবে রেখেছিলাম, পর্তুগিজ ফ্যানদের সঙ্গে একটু আড্ডা দেব, ওদের ফুটবল দর্শন শুনব।
ফ্যান জোনের সামনে গিয়ে বোকা বনে গেলাম। কলম্বিয়ার হলুদ জার্সি পরা হাজার হাজারো মানুষ দাঁড়িয়ে। হলুদের আধিক্যের আপনি সহজেই দু-একজন পর্তুগিজ ফ্যানকে আলাদা করে ফেলতে পারবেন। নিউ ইয়র্কে কলম্বিয়ানদের এই দাপটের ব্যাপারটা আমার অজানা ছিল। ফ্লাশিং মিডোর নিচের সব আসন আগেই ভরে গেছে। এমনকি আপার লেভেলেও জায়গা পাওয়া মুশকিল। এক ফিফা ভলেনটিয়ারের কাছে শুনলাম, এবারের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচেও এত দর্শক হয়নি।
ফিফা ফ্যান জোনের হেড কোয়ার্টারে মিনিটে মিনিটে কলম্বিয়ানদের চিৎকার যেন মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামেও পৌঁছে গেল। হামেশ রদ্রিগেজরা নাড়িয়ে দিয়েছেন পর্তুগিজদের কলিজা। পুরো পরিবার নিয়ে এসেছেন সান্তিয়াগো। ফ্যান জোনে আটজনের পরিবার সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন লোকটা। তিন নাতি তার, সবাই ছোট। জ্বালিয়ে মারছে। নাতিদের ঠান্ডা রাখতে গিয়ে খেলায় অতো মনোযোগ দিতে পারছেন না সান্তিয়াগো। কিছুটা অতৃপ্তি নিয়ে বললেন, ‘ফুটবল দেখে মজা পায়নি আগের মতো। এখন পরিবারই সব। তবে জেনে রেখো, এবারের কলম্বিয়া দল বহুদূর যাবে। বিশ্বকাপও জিতে যেতে পারে।‘
আমি আস্তে করে বললাম, ’আজকের ম্যাচ ড্র হলে কোয়ার্টারে আর্জেন্টিনা পড়তে পারে!’
৬৫ বছরের বুড়ো সান্তিয়াগো হেসে ফেললেন, তা হলে আর হবে না! মেসির ওপর ঈশ্বরের কৃপা আছে।
ম্রিয়মান রোনালদোকে দেখে দ্রুত বেরিয়ে যেতে হলো। সান্তিয়াগোর সঙ্গে খুব বেশি কথা বলার আর সময় নেই। হিল সাইডে বাঙালি কমিউনিটি আর্জেন্টিনার খেলা উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন করেছে। দাওয়াত মিস করা যাবে না। এদিকে আর্জেন্টিনার খেলাও শিগগিরি শুরু হয়ে যাবে। দ্রুত পা চালাতে লাগলাম।
রেস্তোরাঁর আড্ডা আর মেসির জাদু
হিল সাইডের পরিচিত বাঙালি রেস্তোরাঁগুলো আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ম্যাচে বেশ সরগরম থাকে। চারদিকে বাঙালির আড্ডা, বিরিয়ানির সুগন্ধ আর টিভির স্ক্রিনে প্রিয় মেসি। আমাদের টেবিলের বন্ধু রিয়াজ চিৎকার করে উঠল, ‘মেসি নামছে! জর্ডানের এবার খবর আছে।’
বদলি নেমে ৮০ মিনিটে মেসি ট্রেড মার্ক ফ্রি-কিক জর্ডানের জালে জড়ালেন, পুরো রেস্তোরাঁ যেন এক নিমেষে ভেঙে পড়ল উচ্ছ্বাসে। জর্ডানের রক্ষণভাগকে বোকা বানিয়ে মেসির সেই ফ্রি-কিক ছিল শৈল্পিক। টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করে গড়লেন ইতিহাস— আর সেই মুহূর্তের সাক্ষী হতে পেরে হিল সাইডের সেই বাঙালি রেস্তোরাঁ বুয়েনস এইরেসের চেয়ে কোনো অংশে কম খুশি হলো না!
খেলা শেষে বিরিয়ানি খেতে খেতে মনে হলো ম্যানহাটনের পাব, ফিফা ফ্যান জোন কিংবা হিল সাইডের বাঙালি রেস্তোরাঁ; একেক জায়গায় ফুটবলের একেক গল্প তৈরি হচ্ছে। ফুটবল এমনই এক খেলা, যা জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার।




