আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে?

প্রতীকী ছবি
মানুষের মর্যাদা শুধু তার জ্ঞান, সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচয়ে নির্ধারিত হয় না। একজন মানুষ কতটা অন্যের উপকারে আসতে পারে, তার মধ্যেও তার প্রকৃত মহত্ত্বের পরিচয় নিহিত। ইসলাম এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখায়, যেখানে মানুষ শুধু নিজের কল্যাণ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে না; বরং অন্যের দুঃখ লাঘব করবে, বিপদে পাশে দাঁড়াবে এবং মানুষের জীবনকে সহজ করার চেষ্টা করবে। এ কারণেই মহানবী (সা.) মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে মানুষের উপকার করার বিষয়টিকে সামনে এনেছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ
অর্থাৎ, ‘আল্লাহর কাছে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সে-ই, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।’ (সিলসিলাতুল আহাদিসিস সাহিহাহ, হাদিস: ৯০৬)
হাদিসটির সৌন্দর্য হলো, এখানে আল্লাহর কাছে মানুষের প্রিয় হওয়ার সঙ্গে অন্যের উপকার করার সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ একজন মানুষ যত বেশি মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করবে, আল্লাহর কাছে তার মর্যাদাও তত বেশি হওয়ার আশা করা যায়।
মানুষের উপকার করতে সবসময় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না। একজন চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসা করে উপকার করতে পারেন, একজন শিক্ষক জ্ঞান দিয়ে মানুষের ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে পারেন, একজন ব্যবসায়ী সততার সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পারেন। আবার একজন সাধারণ মানুষও বৃদ্ধকে রাস্তা পার করে দিয়ে, অসহায় ব্যক্তির বোঝা বহন করে, পথহারা মানুষকে পথ দেখিয়ে কিংবা বিপদগ্রস্ত কাউকে সামান্য সহযোগিতা করে মানুষের উপকার করতে পারেন।
মহানবী (সা.) সাদাকার ক্ষেত্রটিকেও এভাবেই বিস্তৃত করেছেন। তিনি বলেছেন,
كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ
‘প্রতিটি ভালো কাজই সাদাকা।’ (বুখারি, হাদিস: ৬০২১)
অর্থাৎ কল্যাণের সুযোগ আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। একটি হাসি, একটি ভালো কথা, একটি সহযোগিতার হাত কিংবা কারও কষ্ট দূর করার ছোট্ট প্রচেষ্টাও আল্লাহর কাছে মূল্যবান হতে পারে।
পবিত্র কোরআনেও মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ
অর্থাৎ, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করো।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ২) এই নির্দেশ শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজের কল্যাণে পরস্পরের সহযোগিতাকেও এর অন্তর্ভুক্ত করে।
তবে মানুষের উপকার করার অর্থ শুধু বস্তুগত সাহায্য নয়। কখনো একজন হতাশ মানুষকে আশার কথা বলা, বিপথগামী কাউকে সঠিক পথের সন্ধান দেওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া, জ্ঞানহীনকে জ্ঞান দেওয়া কিংবা কারও ভুল সুন্দরভাবে সংশোধন করে দেওয়াও মানুষের উপকার। এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণের দিকে পথনির্দেশ করে, সে ওই কাজ সম্পাদনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৬৭০)
আজকের সমাজে মানুষের প্রয়োজনের শেষ নেই। কেউ অর্থের সংকটে, কেউ জ্ঞানের অভাবে, কেউ একাকিত্বে, কেউবা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এমন সময়ে একজন মুমিনের দায়িত্ব শুধু নিজের ইবাদতে সীমাবদ্ধ থাকা নয়; বরং মানুষের কষ্ট অনুভব করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তা লাঘব করার চেষ্টা করা।
তাই জীবনের সাফল্য শুধু ‘আমি কী পেলাম’ এই প্রশ্নে নয়, বরং ‘আমি অন্যের জন্য কী করতে পেরেছি’ এই প্রশ্নেও খুঁজতে হবে। যে মানুষ নিজের সামর্থ্যকে মানুষের কল্যাণে ব্যয় করে, তার জীবন শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও আশীর্বাদ হয়ে ওঠে। আর হাদিসের ভাষায়, মানুষের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই ব্যক্তি, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকারে আসে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক







