ডিসেম্বর পর্যন্ত আন্দোলন টেনে নেবে ১১ দল

সাত দফা দাবিতে চলমান আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। আগের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আগামী ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথা থাকলেও নতুন করে রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগে লং মার্চ আয়োজনের প্রস্তাব এসেছে জোটের ভেতর থেকে। এসব কর্মসূচি চূড়ান্ত হলে আন্দোলনের সমাপনী মহাসমাবেশ পিছিয়ে ডিসেম্বর কিংবা আগামী বছরের জানুয়ারিতে নেওয়া হতে পারে।
চট্টগ্রাম থেকে রংপুর, এরপর খুলনা ও সিলেট— এভাবে ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দেশ জুড়ে আন্দোলনের গতি বাড়াতে চায় জোটটি। এর মধ্যে দুটি বিভাগে লং মার্চের পর আরও নতুন এলাকায় কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। জোটের নেতারা বলছেন, লং মার্চে সাধারণ মানুষের সাড়া পাওয়ায় আন্দোলনের পরিধি বাড়ানোর দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। সে বিবেচনায় রাজশাহী ও বরিশালকে প্রাথমিকভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক থেকে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লং মার্চের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ১১ দলীয় ঐক্যের ধারাবাহিক কর্মসূচি। এর দুই সপ্তাহ পর, ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে দ্বিতীয় লং মার্চ করে জোটটি। আগের ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর সিলেট অভিমুখে লং মার্চ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। তবে নতুন করে আরও দুটি বিভাগে লং মার্চ যুক্ত হলে পুরো কর্মসূচিতেই পরিবর্তন আসতে পারে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান আগামীর সময়কে বলেছেন, ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটির সভায় আরও দুটি বিভাগে লং মার্চ আয়োজনের প্রাথমিক প্রস্তাব এসেছে। জনগণের পক্ষ থেকেও এ ধরনের কর্মসূচির দাবি উঠছে। সে বিবেচনায় রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগে লং মার্চের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন জোটের শীর্ষ নেতারা।
রাশেদ প্রধান জানিয়েছেন, নতুন দুটি লং মার্চের সিদ্ধান্ত হলে সমাপনী মহাসমাবেশ পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে ডিসেম্বর কিংবা আগামী বছরের জানুয়ারিতে ঢাকায় মহাসমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হতে পারে।
এদিকে সিলেট অভিমুখে লং মার্চের ধরন নিয়েও ভাবছে জোটটি। ট্রেনে সাধারণ যাত্রীদের নিয়মিত যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নে কোনো ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হবে কি না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে সড়কপথে লং মার্চের বিকল্পও খোলা রাখা হয়েছে। ট্রেনে যাত্রার সিদ্ধান্ত হলে পথসভা কমিয়ে রেলস্টেশনকেন্দ্রিক কর্মসূচি পালনের চিন্তা রয়েছে, যাতে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি না বাড়ে।
১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, লং মার্চে জনগণের ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। আরও কয়েকটি বিভাগে কর্মসূচি আয়োজনের প্রস্তাব আসছে। আপাতত রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
জোটের আন্দোলন অবশ্য শুধু বিভাগীয় লং মার্চ কিংবা মহাসমাবেশে সীমাবদ্ধ নয়। শুরুতে ছয় দফা দাবি নিয়ে মাঠে নামলেও সময়ের সঙ্গে দাবির পরিধি বেড়েছে। চট্টগ্রাম অভিমুখে প্রথম লং মার্চে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবি তুলে ধরে জোটটি। পরে এর সঙ্গে দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি যুক্ত হয়। রংপুরের কর্মসূচিতেও যুক্ত করা হয় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি। আগামী দিনের বিভাগীয় কর্মসূচিতেও স্থানীয় ও আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজপথের কর্মসূচি বিস্তৃত করার পাশাপাশি সংবিধান সংশোধন নিয়ে সরকারের উদ্যোগের বিরোধিতাও জোরালো করছে ১১ দলীয় ঐক্য। সংবিধান সংশোধনের পর নতুন করে গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জোটটির নেতারা বলছেন, আগে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।
জানুয়ারির অধিবেশনেই জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনের বিল তোলা হবে বলে জানিয়েছেন এ-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তার ভাষ্য, প্রস্তাবনায় পরিবর্তন আসায় সংশোধনী সংসদে পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোট আয়োজন করা হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিরোধী দলকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বললেন, বিভেদ নয়, জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতেই সংবিধান সংশোধনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আনা হলে গণভোট আয়োজনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে সরকারের এই উদ্যোগের সঙ্গে একমত নয় বিরোধী জোট। সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম মনে করেন, সংশোধনের নামে সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করার চেষ্টা চলছে। তার ভাষায়, রাষ্ট্রের ‘কসমেটিকস সার্জারি’ নয়, প্রয়োজন মৌলিক সংস্কার। এ লক্ষ্যে দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
একই অবস্থানে রয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। জাগপা মুখপাত্র রাশেদ প্রধানের বক্তব্য, জনগণ গণভোটে যে রায় দিয়েছে, তা-ই বাস্তবায়ন করতে হবে। সংশোধন কিংবা বিশেষ কোনো কমিটির মাধ্যমে নয়, গণরায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। এ কারণে নতুন করে গণভোট আয়োজনের প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করছে জোটটি।
সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারের এই বিতর্কে আইনি দিকটিও সামনে আনছেন জামায়াতের নেতারা। দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের মতে, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায় না। অতীতে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, ত্রয়োদশ, পঞ্চদশ ও ষোড়শ সংশোধনীর বিভিন্ন অংশ আদালতের রায়ে বাতিল বা অসাংবিধানিক ঘোষিত হওয়ার নজির তুলে ধরে তিনি বললেন, একই ধরনের আইনি জটিলতা এড়াতে সংবিধান সংস্কারে গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
শিশির মনিরের ভাষ্য, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে কোনো পরিবর্তন অনুমোদিত হলেই তা চূড়ান্ত সাংবিধানিক বৈধতা পায় না। সংশোধনী সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে ভবিষ্যতে আদালতে তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
এভাবেই একদিকে বিভাগ থেকে বিভাগে লং মার্চের মাধ্যমে রাজপথের আন্দোলন বিস্তৃত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ১১ দলীয় ঐক্য, অন্যদিকে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে তাদের মতপার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। নতুন কর্মসূচির প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত হলে আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ শুধু সময়ের হিসাবে নয়, রাজনৈতিক আলোচনার পরিসরেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



