পতনের কথা কল্পনাও করেনি আ.লীগ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে পতন হয় দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর টানা ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের; কিন্তু সেদিন দুপুরের আগপর্যন্ত ক্ষমতা হারানোর কোনো আলামতই আঁচ করতে পারেনি বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের কর্মী— সবারই বিশ্বাস ছিল, অতীতের অন্যান্য রাজনৈতিক আন্দোলনের মতো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকেও শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হবেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। সাময়িক এ চাপ সামলে আবারও নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দেবেন তিনি। সে আশায়ই সেদিন দুপুরের আগপর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশেই মাঠে ছিলেন দলটির নেতাকর্মীরা।
আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে, ক্ষমতার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দলের নীতিনির্ধারকরা ব্যর্থ হন বাস্তব পরিস্থিতি সঠিকভাবে মূল্যায়নে। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার একগুঁয়েমি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের পাশাপাশি সারা দেশে নেতাকর্মীদের মারমুখী অবস্থান আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের।
দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের পেছনে ছিল নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতা। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ দমন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত রাতের ভোট-পরবর্তী আন্দোলন দমন এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে বিএনপির টানা অবরোধ-হরতাল ভেস্তে দেওয়ার নজির তাদের সামনেই ছিল। জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোয় এসব স্মৃতি সামনে রেখে নতুন স্বপ্নে বিভোর ছিলেন সবাই।
দলের নীতিনির্ধারকরা ভেবেছিলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান এবং দলীয় ক্যাডারদের রাজপথে রেখে বিগত আন্দোলনগুলোর মতোই এ ছাত্র আন্দোলনকেও স্তব্ধ করে দেওয়া যাবে। এ ছাড়া আন্দোলনের পেছনে বিরোধী দলের উসকানি রয়েছে দাবি করে মূল দাবিগুলোকে বারবার হালকা করে দেখা হয়েছিল; কিন্তু জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যখন সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনে রূপ নেয়, তখনো দলের ভেতরের মূল আলোচনা ছিল কীভাবে আন্দোলনকারীদের দমিয়ে রাখা যায়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তরফ থেকে সরকারপ্রধানকে মাঠপর্যায়ের সঠিক চিত্র না দিয়ে আন্দোলন প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে— এমন ভুল ও আশ্বাসমূলক তথ্য দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার আশা ছিল, প্রশাসনের ওপর দলের যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছিল, তা থেকে আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
পতনের আগের দিন ৪ আগস্ট রাজপথে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনকে ছাত্র-জনতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল রাজনৈতিকভাবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। ওইদিন সারা দেশে ব্যাপক সংঘাত ও প্রাণহানি ঘটে। তবুও আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেছিলেন, রাজপথ তাদের দখলেই রয়েছে এবং শেখ হাসিনা সবকিছু সামলে নেবেন।
কিন্তু ৫ আগস্ট সকালে যখন লাখ লাখ মানুষ ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে ঢাকার রাজপথে নেমে আসেন, সব হিসাবনিকাশ মুহূর্তেই পাল্টে যায়। পরিস্থিতি তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যগুলোতেও উঠে আসে ভয়ানক চিত্র। গণভবন ও বঙ্গভবনকে ঘিরে নিরাপত্তাবেষ্টনী রক্ষা করা যে আর সম্ভব নয়, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে। তখন শেখ হাসিনার সামনে দেশত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো পথই খোলা ছিল না। তবে তখনো আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ঘোরের মধ্যে। রাজপথে তাদের অবস্থান সুসংহত। দুপুরের আগপর্যন্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, দলীয় সভানেত্রীর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় ও প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবন সরগরম। পাড়া-মহল্লায় সশস্ত্র অবস্থানে নেতাকর্মীরা। অবশেষে দুপুরের আগে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ভারতে চলে যাওয়ার খবর চাউর হওয়ার পর দেশ জুড়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা চরম বিভ্রান্তি ও ধাক্কার মুখে পড়েন। অনেকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পুরো ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটে গেছে। পতনের পর যে বিশৃঙ্খলা ও নেতৃত্বহীনতায় পরিষ্কার হয় আওয়ামী লীগের কোনো পর্যায়েরই এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো দলীয় নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে। রাজনৈতিক সংকটকে শুধু নিরাপত্তার চশমায় দেখার ফলেই ৫ আগস্টের পর খেসারত দিতে হচ্ছে দলটিকে।




