প্রতিবাদ এখন কেন করছেন না? যে ব্যাখ্যা দিলেন উপদেষ্টা জাহেদ

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। আজ সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে। ছবি: আগামীর সময়
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে আওয়ামী লীগ আমলে প্রতিবাদ করলেও এখন কেন তা করছেন না, তার ব্যাখ্যা দিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো বৈধতা ছিল না। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার।
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরে সরকারের কাজের অগ্রগতি নিয়ে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন জাহেদ।
সরকার দেশের বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তার প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে।
এনিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘আমি যদি সরকারে না থেকে অ্যাক্টিভিস্ট হতাম, তাহলে এর প্রতিবাদ করতাম, হাসিনার সময় হলে শুধু প্রতিবাদ নয়, হাসিনার পদত্যাগ চাইতাম। এখন চাওয়া উচিৎ হবে না।’
কেন উচিৎ হবে না- তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘কারণ ওই সরকারকে আমরা ওন করতাম না, ওই সরকারের লেজিটিমেসি ছিল না। কিন্তু এই সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার। এটা আমাদের সবার সরকার।’
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনার সুযোগ থাকলেও ভর্তুকির চাপ কমাতে সরকারে কাছে বিকল্প কিছু ছিল না বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি নানা খাতে ভর্তুিকর হিসাবও সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে কথা উঠেছে, তা নাকচ করেন জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেন, ‘এমন কোনো শর্ত আসলে নেই। আইএমএফের বেসিক যে নিয়ম আছে, তারা চায় না সরকার ভর্তুকি দিক। আপনারা দেখবেন, এ নিয়ম আমরা সব সময় মেনে যাচ্ছি না।’
ফ্যামিলি কার্ডসহ জনকল্যাণে নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচিতে সরকারের অর্থ বরাদ্দের দিকটি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের জনগণের কল্যাণে এটা করে যাচ্ছি, এর সঙ্গে (আইএমএফের পরামর্শের) কোনো সম্পর্ক নেই।’
আন্তর্জাতিক বাজার দরে ডিজেল কিনে দেশে কম দামে বিক্রি করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানান উপদেষ্টা জাহেদ।
তিনি বলেন, বাজারমূল্য অনুযায়ী ডিজেলে লিটারপ্রতি প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছে। দৈনিক লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানো হলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান মূল্য সমন্বয়ের পরও ডিজেলের ক্ষেত্রে প্রতি লিটারে সরকারের উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি রয়েছে। কাগজে-কলমে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কিছুটা কমলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানি খাতে সরকারের ওপর বড় ধরনের ভর্তুকির চাপ থাকছে।
জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার জনপ্রিয়তা হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জনগণের কষ্ট হচ্ছে এবং আরও কষ্ট হতে পারে, এটি সরকার স্বীকার করছে। তবে সরকার ইচ্ছা করে জনগণকে অসন্তুষ্ট করার জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেয়নি।
তিনি বলেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন রয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণকে কষ্ট দিয়ে সরকার নিজের রাজনৈতিক ক্ষতি করতে চাইবে—এমন কোনো কারণ নেই। তবে জ্বালানি খাতে কতটা ভর্তুকি দেওয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব, সেটিও বিবেচনায় নিতে হয়।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, চলতি অর্থবছরের বাজেটে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু অর্থবছরের মাত্র আড়াই মাসেই এর প্রায় অর্ধেক ব্যয় হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, এভাবে ভর্তুকি দেওয়ার ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ সোয়া এক লাখ কোটি থেকে দেড় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এর সঙ্গে জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য খাতের ভর্তুকি যোগ হলে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার তুলে ধরে তিনি বলেন, ভর্তুকির পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও সরকার ব্যয় করতে চায়। ফলে সীমিত সম্পদ কোথায় কতটা বরাদ্দ করা হবে, সেখানে সরকারকে ভারসাম্য করতে হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি খাতের অগ্রগতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, জাতীয় গ্রিডে আরও ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে। আগস্টে গ্যাস সরবরাহে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই কেটে গেছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয় কোম্পানির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা চলছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস-২৮ কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন কূপ খনন ও পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর কাজ চলছে।
নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে হবিগঞ্জ ও সংলগ্ন এলাকায় ৮৭৫ বর্গকিলোমিটার এবং বাখরাবাদ, নরসিংদী ও মেঘনা ফিল্ড এলাকায় ৫৭৫ বর্গকিলোমিটারসহ মোট ১ হাজার ৪৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ করা হচ্ছে। তিতাস ফিল্ডের উত্তর-পশ্চিম এবং নরসিংদী ফিল্ডের উত্তর-পূর্ব এলাকায় ৬৩২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক জরিপ পরিচালনার কাজও চলছে।
অক্টোবরে শুরু ফ্যামিলি কার্ড
সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অন্যতম উদ্যোগ ফ্যামিলি কার্ড আগামী অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, ১ আগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এ কাজে প্রায় ৬০ হাজার ৭৬১ জন তথ্যসংগ্রহকারী নিয়োজিত ছিলেন।
প্রাথমিকভাবে ভূমিহীন, গৃহহীন, প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছে এমন পরিবার, হিজড়া, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং আধা একর বা তার কম জমির মালিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে সরকারি চাকরিজীবী, পেনশনার, বড় ব্যবসায়ী এবং গাড়ি, এসি বা বিলাসবহুল সম্পদের মালিক পরিবারগুলোকে প্রাথমিকভাবে ফ্যামিলি কার্ডের আওতার বাইরে রাখা হচ্ছে। একটি পরিবারকে একটি কার্ড দেওয়া হবে।



