জ্বালানি সংকটে হাজার গাড়ির লং মার্চে প্রশ্ন বিএনপির
- বিএনপির দাবি, দেশে চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট বর্তমান সরকারের সৃষ্টি নয়
- ‘শুধু সমালোচনা নয়— কীভাবে সংকট মোকাবিলা করা যায়, বিরোধী দলকে সেই পরিকল্পনাও দিতে হবে।’ -রুহুল কবির রিজভী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার অবনতিসহ বেশ কয়েকটি ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের লং মার্চ কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, সংকট সমাধানে সরকার যখন কাজ করছে এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস দিচ্ছে, তখন মাত্র ছয় মাসের মাথায় হাজারো গাড়ি নিয়ে দেশ জুড়ে লং মার্চের মতো কর্মসূচি কতটা যৌক্তিক, তা বিরোধী জোটকেই ভেবে দেখা উচিত।
বিএনপি নেতাদের দাবি, দেশে চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট বর্তমান সরকারের সৃষ্টি নয়। এর পেছনে রয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানিনির্ভরতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। এর সঙ্গে বৈশ্বিক যুদ্ধ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। তবে সংকট সমাধানে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে বলে দাবি তাদের। এসব ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নেও সরকার আন্তরিক বলে জানিয়েছেন তারা।
এমন প্রেক্ষাপটে ছয় দফা দাবিতে মাঠে নেমেছে ১১ দলীয় ঐক্য। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি তেল-গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে গতকাল শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী লং মার্চের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু করেছে তারা। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ১০ অক্টোবর খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর সিলেট অভিমুখে লং মার্চ করার ঘোষণা দিয়েছে জোটটি।
বিরোধী জোটের এই কর্মসূচির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। ফরিদপুরের নগরকান্দায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এক সমাবেশে তিনি বলেছেন, বিরোধী দল দেশে তেল নেই বলে অভিযোগ করছে। তাহলে হাজার হাজার গাড়ি নিয়ে এত বড় লং মার্চ কীভাবে করছে— এ প্রশ্নও ওঠে।
শামা ওবায়েদের ভাষ্য, বিরোধী দল নিজেরাও জানে দেশে কোনো সমস্যা নেই; কোনো ‘ইস্যু’ না পেয়ে তারা লং মার্চ করছে। বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে সংসদে গিয়ে কথা বলার জন্য বিরোধীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিএনপির নেতাদের অনেকে বলছেন, সরকারের সমালোচনা করা এবং সংসদের বাইরেও কর্মসূচি দেওয়া বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু তাদের মতে, সংকট মোকাবিলায় সরকার যেখানে কাজ করছে, সেখানে সমালোচনার পাশাপাশি কার্যকর বিকল্প পরিকল্পনাও দেওয়া উচিত বিরোধী জোটের।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স আগামীর সময়কে বলেছেন, জ্বালানি সংকটের মধ্যে হাজারের বেশি গাড়ি নিয়ে লং মার্চ হলে সেখানে বিপুল জ্বালানি খরচ হবে। এতে সংকট আরও বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বাড়তে পারে। তাই এ ধরনের কর্মসূচিকে তিনি ‘অবিবেচনাপ্রসূত’ বলে মন্তব্য করেছেন।
লং মার্চের পাশাপাশি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার পতনের হুঁশিয়ারি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপি নেতারা। এমরান সালেহ প্রিন্স বলেছেন, ডিসেম্বর ঘিরে বিরোধী জোটের সরকার পতনের কর্মসূচি এবং শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার বক্তব্যের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা সরকারকে গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।
একই সুরে আন্দোলনের নামে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন। তার মতে, জাতীয় সংসদ যখন কার্যকরভাবে চলছে, তখন সংসদীয় বিতর্ককে দ্রুত রাজপথে নিয়ে যাওয়ার মতো কর্মসূচি সাধারণ মানুষের গণআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী। এ ধরনের পরিস্থিতির সুযোগ নিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল অপেক্ষায় থাকে বলেও মন্তব্য তার।
সরকার যে সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে, সেটি স্পষ্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত বুধবার সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের জন্য আগের সরকারকে দায়ী করেছেন। তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া পরিকল্পনার কারণে জ্বালানি খাত কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়ে। অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানিনির্ভরতার দীর্ঘমেয়াদি ফল হিসেবে বর্তমান সংকট সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বিএনপির দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো। বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নেও সরকার কাজ করছে বলে তাদের দাবি।
জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা শেষে একটি সংবিধান সংশোধনী বিল আনা হবে। সেটি পাস হলে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পথ তৈরি হবে।
তবে এই কমিটি নিয়েও শুরু থেকেই বিরোধ রয়েছে। কমিটিতে বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্যের নাম দেওয়ার আহ্বান জানানো হলে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট কোনো নাম দেয়নি। কমিটি গঠনের দিনই সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে তারা। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান তখন বলেছিলেন, সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে তাদের সঙ্গে সরকারের ধারণাগত মতপার্থক্য রয়েছে।
এদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীও বিরোধী দলের কর্মসূচির অধিকার স্বীকার করলেও সংকট সমাধানে কার্যকর পরিকল্পনা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, সংসদের বাইরে কর্মসূচি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চা হলেও পরিকল্পিত অচলাবস্থা তৈরি করা উচিত নয়।
রিজভীর ভাষায়, শুধু সমালোচনা নয়— কীভাবে সংকট মোকাবিলা করা যায়, বিরোধী দলকে সেই পরিকল্পনাও দিতে হবে। অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হলে পরিস্থিতি আরও অন্ধকারের দিকে যাবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।





